Header Ads

Header ADS

আঁধারের আড়ালে


আঁধারের আড়ালে
শীর্ষক দত্ত

বিস্তৃত স্বল্পঝোপ পূর্ণ পতিত জমি চিঁড়ে আসা অন্ধকার রাস্তায়ে বহু দূরে একটি লাল আলোকবিন্দু দেখেই সচেতন হয়ে উঠল অগ্নির তৃতীয় চোখ। মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে দ্রুতগতিতে ছুটতে শুরু করল বিস্তৃত জমি দিয়ে। কালো ওভারকোট আর হ্যাট পরা অগ্নিকে এই জনমানবহীন আলোক প্রান্তরে খুজে পাওয়া পুলিশের সাধ্য না। পুলিশ যখন হলদিয়া বন্দরে পৌঁছাবে , ততক্ষণে হয়তো  হিরোইন লেনদেন শেষ করে কালো টাকা নিয়ে অগ্নি তখন কোলকাতার পথে। কাল অগ্নির নামে আর একটি ফাইল তৈরি হবে পুলিশের কাছে, হয়তো আরেকটা স্কেচ যা আগেরগুলোর মতোই তার চেহারার অনেক দূর দিয়ে যাবে। মুখোশের আড়ালেই অগ্নি থেকে যাবে শহরের সভ্য জগতে। যে জগতে সে একদিন থাকতে চেয়েছিল সভ্যভাবেই। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী তাকে ছুড়ে দিয়েছে সভ্য সমাজের আড়ালে থাকা অন্ধকার জগতে। এই অন্ধকার জগত তাকে সবই দিয়েছে। সভ্য সমাজে মানুষের মতো বাঁচার অধিকারও দিয়েছে, যেটা একসময়ে তার ছিল না। একদিন দারিদ্রের কাছে নিজের সততাকে বিসর্জন দিয়ে প্রবেশ করতে হয়েছিল অন্ধকার জগতে, আজ যে জগতের নায়ক সে।

একটা হাই তুলে বাইরের দিকে তাকাল সৌম্যজিৎকোলকাতার ব্যস্ততাটা চোখে পড়লেও কোলাহলটা গাড়ির জানালা ভেদ করে কানে আসতে পারে না। মনে হয় নিস্তব্দ বিশৃঙ্খলা । রাত জাগার ক্লান্তি তার চোখে স্পষ্ট না হলেও মনটা যথেষ্টই ক্লান্ত। কলেজ স্ট্রিট সিগন্যাল পেরোনোর পর গাড়ির গতি সবে বাড়তে শুরু করেছে, হঠাৎই সৌম্যজিতের চিৎকারে সশব্দে ব্রেক কষল ড্রাইভার। গাড়ির দরজা খুলে সটান রাস্তায়ে লাফিয়ে পড়লো সৌম্যজিৎ গিয়ে দাঁড়ালো ফুটপাতের একটি ছোট বইয়ের দোকানের সামনে। খালি গায়ের একজন পুরনো দোকানে বসে আছে, আর তার সামনে একটি বাচ্চা ছেলে বই বাঁধাই করছে। একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে ড্রাইভার বাইরে মুখ বের করল কি ঘটেছে টা দেখার জন্য , কিন্তু পেছনের গাড়িগুলির ক্রমাগত হর্ন এর জন্য আবার গাড়ি স্টার্ট দিলো, একটু বাঁদিকে করে দাঁড়াবে বলে। তখনই ভিউ ফাইন্ডারে লক্ষ্য করলো পেছনের দরজাটা খোলা। হর্ন আর লোকজনের গালাগালি শুনতে শুনতেই পেছনের দরজা আটকে গাড়িটা সবে পার্ক করলো। এমন সময়  উত্তেজিত ভাবে সৌম্যজিৎ সেই ছেলেটাকে নিয়ে এসে গাড়িতে উঠল। গাড়িটা কিছুদূর এগোনোর পর সৌম্যজিৎ এর নির্দেশ এলো বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য। ড্রাইভার একটু আড়চোখে সৌম্যজিতের দিকে তাকাল। একটু আগেই কিসব জরুরী মিটিং আছে বলে তাড়া দিচ্ছিল আর এখন বাড়ি যেতে বলছে, এখনই জরুরী মিটিং। মুখে একটা ব্যাঙ্গাত্তক হাসি হেসে ড্রাইভার গাড়িটা ঘোরালো। 

বাড়ির চাকরেরা তার নির্দেশে ছেলেটাকে ভাল ভাল খাবার এনে দিতে লাগলো, যত্নের কোন ত্রুটি হল না। সৌম্যজিৎ বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। তার মনের ভেতর আজ এক ঝড় উঠেছে , বার বার মনে পড়ছে তার আগের জীবনের কথা। প্রায়ে ৩১ বছর আগে সে কাজ করত শহরের নামকরা একটি চায়ের দোকানে। তখন শিশুশ্রমের বিষয়ে এত সচেতনটা ছিল না। ছিল না আইনও। তাই সব দোকানই নির্দ্বিধায়ে শিশু কর্মচারী রাখতো। কম মজুরী, অত্যাচার , এসবও চলত অবাধে। এই দোকানেই একদিন সে কি করে যেন নজরে পরে যায়ে অনাথবাবুর১১ বছরের সৌম্যজিতের মধ্যে তিনি কি ট্যালেন্ট দেখলেন তিনিই জানেন। সৌম্যজিৎ - কে নিয়ে আসেন তার নিজের বাড়িতে। সেদিন রাতেই সৌম্যজিতের হাতে একটি কাগজের প্যাকেট দিয়েছিলেন অনাথবাবু। সেই থেকেই অন্ধকার জীবনে তার পদার্পণ। সৌম্যজিৎ নাম হয়ে দাড়ায় অগ্নিতে। কালক্রমে সে অনাথবাবুর চেয়েও ধুরন্ধর কারবারি হয়ে ওঠে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে অনাথবাবুর উত্তরসূরিরূপে। অনাথবাবুর মৃত্যুর পর সেই হয়ে ওঠে কোলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ড –এর কর্ণধার। সভ্য সমাজের সৌম্যজিৎ আধারের আড়ালে অগ্নি নামে ক্রমশ এগিয়ে যেতে থাকে। 

 

 


অগ্নির বয়স ক্রমশ বাড়ছে –এবার তারও বিদায়ে নেওয়ার পালা। কিন্তু তার আগে তাকেও ঠিক করে যেতে হবে তার উত্তরসূরি। রতনে রতন চেনে- অগ্নির মধ্যে নাকি ট্যালেন্ট ছিল। তাই অগ্নিও খুঁজে পেয়েছে এই ছেলেকে। একটি অদ্ভুত কৌশলে বই বাঁধাই করছিল ছেলেটি- কয়েকটি সূচকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করছিল যা বই বাঁধাইয়ের ছকবাঁধা নিয়ম না। কয়েকটি সূচ আর সুতো দিয়ে এই নিজের তৈরি সরলযন্ত্রের এই এত সহজ ব্যবহার হয়েত কোন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারেরও মাথায় আসবে না। বাস্তব জীবনে এইসব ছোট ছোট মেকানিক্সের ব্যবহার তাদের মাথার একটু বেশি নীচ দিয়েই বেরিয়ে যায়ে। আর এই ছেলেটির এই ট্যালেন্ট-এর মূল্যায়ন হয়তো তার কাজের এই সামান্য সুবিধাটুকুই – খুবই ছোট কিন্তু গুরুত্ব টা কম নয়। আর তা দেখেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল অগ্নির মস্তিষ্কের কোষগুলি । আজ অগ্নি খুজে পেয়েছে তার উত্তরসূরি। এই ছেলেটিকেই তৈরি করতে হবে আন্ডারওয়ার্ল্ড –এর রাজারুপে। তবুও মনের মধ্যে তার প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব , হয়তো সৌম্যজিৎ আর অগ্নির মধ্যে। সৌম্যজিৎ আর অগ্নি একই হলেও ঠিক যেন এক নয়। সৌম্যজিৎ তার ভদ্রসমাজের মুখ আর অগ্নি হল টিকে থাকার একটা খুঁটি, উন্নয়নের সিঁড়ি । প্রায় তিনদশক পর , প্রথমবার-এর মতন তার মনে জেগে উঠেছে ছোট্ট সৌম্যজিতের স্মৃতি , অন্ধকার জগতে প্রবেশের পূর্বে ...... তার পরিশ্রম করে বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন, অনেকদূর অবধি পড়াশোনার স্বপ্ন। সৌম্যজিতের সে স্বপ্ন কোন দিনও পুরন হয়েনি, সৌম্যজিতের কোন উত্তরসূরিও নেই। অবশেষে সমস্ত দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে দিলো সে। একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিজের মনেই নিল সে।

সন্ধেবেলা সৌম্যজিতের দামী বাড়িতে ৩১ বছর আগেকার একটি ঘটনার পুনঃপ্রচার ঘটল। ক্লান্ত সৌম্যজিৎ একটা বড় কাগজের প্যাকেট এনে ছেলেটির হাতে দিল। ছেলেটি আস্তে আস্তে প্যাকেটটা খুলল – কোলকাতার একটা নামী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের admission form.

No comments

Theme images by saw. Powered by Blogger.