Header Ads

Header ADS

বাতিওয়ালা

বৈদ্যুতিক আলোর আগে গ্যাসের ষ্ট্রীটলাইটই আলোকিত করতো রাতের পথকে, আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিতও কোনও বাতিওয়ালা। বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলনের সাথে সাথে এই বাতিওয়ালারাও কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। শুধু কিছু কবিতা আর রোমান্টিকতাতেই তাদের কথা শোনা যায়। কিন্তু তিনি এই বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানোর কাজই করে গেছেন সারা জীবন ধরে, শুধু করে যাননি বিশ্ববিখ্যাতও হয়েছেন। তার জীবনের নানা অজানা কথা নিয়েই ...

বাতিওয়ালা

শীর্ষক দত্ত

মাধ্যমিক পাশের পর  দিল্লি পলিটেকনিকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ঢুকলেন ১৯৪১ সালে, কিন্তু পড়া  ছেড়ে দিলেন খুবই তাড়াতাড়ি, স্বাধীনভাবেই কাজ শুরু করলেন আলোর যন্ত্রী হিসেবে।  দিল্লীতে যে নাটকই হয়, তার আলোক্সজ্জার দায়িত্ব তুলে নেন নিজের হাতে, লোকের মুখে নাম হতে যায় ‘লাইটওয়ালা’। দিল্লিতে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের শাখা যখন খোলা হল, তিনি তার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সেটা ১৯৪৪ সাল। সেখানেই  করলেন জীবনের প্রথম বড়ো আর অভিনব কাজ,  ছায়ানাট্য ‘ভুশণ্ডীর মাঠে’।  পরশুরামের লেখা এই নাটকের আলোকসজ্জাই তাকে পরিণত করতে শুরু করে বিশ্বের নামকরা একজন আলোকশিল্পীরুপে। তিনি ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত আলোকশিল্পী, বহু পুরষ্কারজয়ী তাপস সেন।

এই মাটির প্রদীপই ছিলো বাংলার প্রথম বাতি

  ১৯২৪ সালে পিতা মতিলাল সেন এবং মাতার নাম সুবর্ণলতার ঘর আলো করেই জন্মগ্রহণ করেন তাপস সেন, যিনি একদিন সারা দুনিয়াই আলোকিত করবেন। ১৯৪৫ সালে চাকরি পান দিল্লীর PWD-Electrical এ, তারপর আরও কিছু সরকারি দপ্তরে। কিন্তু কাজ মনের মতো না হওয়ায় তা ছেড়ে ১৯৪৬ সালে পাড়ি দেন বোম্বেতে, উদ্দেশ্য  ক্যামেরা আর আলোর কাজ শেখা।কিন্তু বোম্বেতে সেভাবে সুবিধা করতে না পারায় ১৯৪৭ সালে ফিরে চলে আসেন কোলকাতায়। 


 বিজন ভট্টাচার্যের ‘নীলদর্পণ’ নাটক দিয়েই কোলকাতায় কাজ শুরু হয় তাপস সেনের। পরবর্তীতে যোগাযোগ হয় অমিতাভ চৌধুরী আর তরুণ রায়ের সঙ্গে। তরুণ রায়ের ‘রূপকথা’ নাটকে সাদা ঘষা কাচের গ্লোবের সামনে বাঁশপাতা ঝুলিয়ে তাপস তৈরি করলেন পূর্ণচাঁদের মায়া যা তাকে একজন দক্ষ আলোকশিল্পীরূপে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি।  ১৯৪৯ সালে শম্ভু মিত্রের বহুরূপী নাট্যদলের জন্মলগ্ন থেকেই তাপস তার সঙ্গী। ‘পথিক’, ‘ছেঁড়া তার’, ‘উলুখাগড়া’ এইসব বিখ্যাত নাটকের পরে  ১৯৫১ সালে ‘চার অধ্যায়’-এর আলোলসজ্জাও তাপস হাতে প্রাণ পেয়েছে। আলোক বিজ্ঞানকে তিনি নিয়ে আসেন শিল্পের স্তরে,"রক্তকরবী","রাজা","রাজা অয়দিপাউস","পুতুল খেলা","অঙ্গার","ফেরারি ফৌজ","কল্লোল" এবং বিশ্বরূপা রঙ্গমঞ্চে "সেতু" নাটকের আলোক পরিকল্পনা বাংলা থিয়েটারে তাপস সেনকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে,বস্তুত বাংলার উল্লেখযোগ্য সব নাট্যদলের নাটকই তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ। কোলকাতায় তখন নাট্যসমাজের সুবর্ণ সময়, একের পর এক নাটক হয়ে চলেছে আর বেশিরভাগেরই দায়িত্বে তাপস। খবরের কাগজ খুললেই অজস্র নাটকের বিজ্ঞাপন আরে সবেতেই একটিই কমন "আলোকসজ্জাঃ তাপস সেন"।


আধুনিক আলোকসজ্জা

আলো নিয়ে তাপসের সৃষ্টি এতটাই বিখ্যাত হয়েছিলো যে, নাটক ছাড়াও বিভিন্ন আলোকসজ্জায় তার ডাক পড়তে শুরু করে। ভারতের বিভিন্ন বিখ্যাত স্থাপত্যগুলির "লাইট আন্ড সাউন্ড" শুরু হয়, আর সেগুলির আলোকসজ্জার জন্য তাপসের কাছে অনুরোধ আস্তে শুরু করে। দিল্লীর লালকেল্লা, পুরাণ কেল্লা আর কুতুব মিনারকে তিনি সাজালেন নিজের হাতে। তার কল্পনা বাস্তবের রূপ পেলো খাজুরাহো, কোণার্ক, এলিফেন্টা গুহা আর মধ্যপ্রদেশের উজ্জ্বয়িনী নগরের অসংখ্য কাজে। তার কাজের জন্যই মধ্যপ্রদেশ সরকার তাকে কালিদাস সম্মানে ভূষিত করে যা মধ্যপ্রদেশের সংস্কৃতির জন্য প্রদেয় সেরা সম্মান। থিয়েটার আর্টস-এ তাঁকে ১৯৭৮ সালে সংগীত নাটক আকাদেমি পুরষ্কার দেওয়া হয়, যা অনুশীলন শিল্পীদের দেওয়া সর্বোচ্চ ভারতীয় স্বীকৃতি। ভারতের জাতীয় সংগীত, নৃত্য ও নাটক একাডেমী পরবর্তীকালে একাডেমীর সর্বোচ্চ সম্মান "সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ" দিয়ে তাকে সম্মানিত করে।

তবে তার জীবণের সেরা সম্মান বোধহয় তখনই পাওয়া হয়, যখন প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের

"লাইট আন্ড সাউন্ড" এর জন্য একটি কমিটি তৈরি করা হয় সমগ্র পৃথিবীর থেকে হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পীকে নিয়ে আর সেইজন্য আমন্ত্রন আসে তাপস সেনের কাছে। তার মতামতের ওপর ভিত্তি করেই আইফেল টাওয়ারের "লাইট আন্ড সাউন্ড"-এর একাধিক কাজ সম্পন্ন হয়। আন্তর্জাতিক স্তুরে যদিও এটাই তার প্রথম কাজ নয়। ১৯৮৮ সালে প্যারিস এবং মস্কোতে "Festival of India"-এর আলোকসজ্জার ডিজাইনও ওনার কীর্তি।


২০০৬ সালে কোলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার জীবনাবসান ঘটে, তারিখটা  ২৮শে জুন। তার দেহ দান করে গিয়েছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য। সেই বছরেরই জানুয়ারিতে মধূসুদন মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "বিসর্জন" নাটকের জন্য আলোকসজ্জার পরিকল্পনা করেন ৮১ বছর বয়সে, সেটাই সম্ভবত তার শেষ কাজ। সারাজীবন ধরে দুনিয়াকে আলোকিত করে যাওয়া এই বাঙালি আজও অনেক বাঙালির কাছেই অজানা রয়ে গেছে।



------





 

 

আরও পড়ুন


বিশ্বের প্রথম অর্থনীতি ছিলো কৃষিনির্ভর। সেখান থেকে ক্রমে অর্থনীতির ভরকেন্দ্র চলে গেলো উৎপাদন (production) শিল্পের হাতে আর বর্তমানে সেবা ক্ষেত্র (service sector). কিন্তু এই নিয়ম ভেঙ্গেই যিনি কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে স্থাপন করেছিলেন একাধিক সার্ভিস ইন্ডাষ্ট্রি, তাও উনবিংশ শতাব্দীর এক ইংরেজ উপনিবেশে আর হয়ে উঠেছিলেন প্রথম ভারতীয় শিল্পপতি...    এক শিল্পপতির কাহিনী

বৈদ্যুতিক আলোর আগে গ্যাসের ষ্ট্রীটলাইটই আলোকিত করতো রাতের পথকে, আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিতও কোনও বাতিওয়ালা। বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলনের সাথে সাথে এই বাতিওয়ালারাও কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। শুধু কিছু কবিতা আর রোমান্টিকতাতেই তাদের কথা শোনা যায়। কিন্তু তিনি এই বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানোর কাজই করে গেছেন সারা জীবন ধরে, শুধু করে যাননি বিশ্ববিখ্যাতও হয়েছেন। তার জীবনের নানা অজানা কথা নিয়েই ... বাতিওয়ালা

 

 









This article is a property of abasor. abasor blogspot is a bengali web magazine. copyright of abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor abasor


Theme images by saw. Powered by Blogger.