টাইম মেশিন
শীর্ষক দত্ত
১
নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে সাত মিনিট দেরিতে এলো ট্রেনটা। তার ওপর প্রচন্ড ভীড়। অনেক ধাক্কাধাক্কি করেই ট্রেনে উঠতে হলো। ওঠার সময়েই মুখ থেকে বেরিয়ে এল বিরক্তিসূচক শব্দ - disgusting. ভীড়ে ঠাসা ট্রেনের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ঘামে পুড়ো ভিজে গেছেন, অস্বস্তিও হচ্ছে খুব। "আশ্চর্য্য, এভাবে মানুষ যাতায়াত করতে পারে নাকি! যতসব ছোটলোকের চলাফেরা। মানুষ যে ট্রেনে কেনো ওঠে কে জানে?" মনে মনে ভাবছিলেন অরিন্দমবাবু। "বালিগঞ্জেও খুব একটা ভীড় হয়নি, বলুন..." কোনো একজনের এরকম মন্তব্য শুনে মনে মনে রেগে উঠলেন তিনি। এটা যদি ভীড় না হয়, তাহলে ভীড় আর কোনটা?
২
গতকালের ঝড়ে লন্ডভন্ড কোলকাতার স্বাভাবিক জীবন। আয়লার মতো না হলেও যথেষ্ট বড়ো ঝড়। শহরের রাস্তাতেই শতাধিক গাছ ভেঙ্গে পড়েছে, অধিকাংশ রাস্তাই বন্ধ, তীব্র যানজটে নাকাল শহরবাসী। ঘন্টার পর ঘন্টা একই জায়গায় দাড়িয়ে গাড়িগুলো। চলছে শুধু ট্রেন আর মেট্রো। পরিবহনের এই অবস্থা না হলে কি অরিন্দমবাবু কোনোদিনও ট্রেনে উঠতেন? 'চ্যাটার্জি কনষ্ট্রাকশন' -এর মালিক অরিকন্দম চ্যাটার্জি তিনি, মাসে দশ লাখ টাকার ওপর তার আয়, তার অধীনে আড়াই হাজার লোক কাজ করে। তার পরিবারের চারজনের বিলাসিতার জন্য ছয়টি গাড়ি, তেরো জন লোক। কেউ বিশ্বাস করবে যে কোলকাতার ধনী ব্যবসায়ী অরিন্দম চ্যাটার্জি তার বালীগঞ্জের বাড়ি থেকে সল্টলেকের অফিসে যাচ্ছেন ট্রেনে চেপে? তিনি নিজেও তো বিশ্বাস করতে পারছেন না। আজ অফিসে একটা জরুরী মিটিং আছে, গুপ্ত ফিনান্সের মালিকের সাথে, এক কোটি টাকার ডিল, তাই অফিস যেতেই হবে......বাধ্য হয়েই তাই ট্রেন ধরতে হলো।
৩
পার্কসার্কাসের পাশ দিয়ে যেতেই তীব্র দূর্গন্ধে মুখে রুমাল চাপা দিলেন। গন্ধটা যেরকম বাজে, সেইরকম অস্বাস্থ্যকর...নাকে প্রথমবার আসতেই বমি পাচ্ছিল। তার দামী মোবাইলে হঠাৎই বেজে উঠলো সুমধুর রিংটোন- কিছু না দেখেই ফোনটা কেটে দিলেন তিনি। এই পরিবেশে ফোন ধরা যায় না। আর ট্রেনভর্তি যতসব ছোটলোক, চামড়া পচা দূর্গন্ধেও স্বাভাবিক আছে। ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করাটাই তো অসম্ভব। শিয়ালদহে ভীড় আর নোংরা দেখে তো রীতিমতো বিরক্ত অরিন্দমবাবু। কালকের ঝড়ের জন্যই তো তাকে ট্রেন ধরতে হয়েছে...না হলে প্রতিদিনের মত নিজের এসি গাড়িতে করে বাইপাস দিয়ে অফিসে চলে যেতে পারতেন। শিয়ালদহে অগণিত লোকের ছোটাছুটি, স্টেশনে শুয়ে থাকা গরিব মানুষ এমনকি নোংরা স্টেশন সবকিছুর মাঝেই বেমানান দামী স্যুট পড়া অরিন্দমবাবু। না পারছেন সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে, না পারছেন একটু বসতে।
৪
ট্রেনে যে মানুষ যাতায়াত করে ট্রেন আর স্টেশনের পরিবেশ দেখে তা মনেই হয় না। বালীগঞ্জ থেকে শিয়ালদহের এই সামান্য যাত্রাই হয়তো এক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে অরিন্দমবাবুর জীবনে.................................আজ এই অভিজ্ঞতা তিক্ত হলেও একদিন কিন্তু এই যাতায়াত তার কাছে তিক্ত ছিল না। আজ থেকে পনেরো বছর আগে ক্যানিং থেকে কোলকাতা এই পথেরই নিত্যযাত্রী ছিলো সে।
ক্যানিং-এর নিজের বাড়ি থেকে কোলকাতায় কলেজে সে ট্রেনে করেই পড়তে আসতো, এর থেকেও বেশি ভীড় ঠেলে। আজ যাদের ছোটলোক বলে মনে হচ্ছে, একদিন সেও ছিলো এদেরই মতো ছোটলোক। এই পথের ধারের দৃশ্য, পথের সবকিছুই তার মুখস্ত ছিলো।এই বালীগঞ্জের ওপর দিয়েইসে ট্রেনে আসতো, এই শিয়ালদহেই আসতো। গরীব ঘরের মেধাবী ছেলে ছিলো, অনেক কষ্টে শেষ করেছিলো তার পড়াশোনা। নিজের তাক লাগানো রেজাল্টের জোরে পেয়েছিলো সরকারী সহায়তা। সরকারী সাহায্য আর নিজের মেধার জোরে পাশ করেছে এম,বি,এ। অসংখ্য চাকরীর প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে নিজেই খুলেছিলো ফার্ম। এরপর তার উন্নতি ছিলো শুধু সময়ের অপেক্ষা।
৫
ধাপে ধাপে তার কোম্পানী লাভের চূড়ান্ত শিখরে উঠেছে। যাতায়াতের সময় যে বালীগঞ্জকে তারা ধনীদের অঞ্চল বলে জানতোন দক্ষিণ কোলকাতার সেই অঞ্চলেই এখন তার নিবাস। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে তার জীবন। স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে তার এখন এক ভদ্রলোক ধনী পরিবার। পর্যায়ক্রমিক লাভ আর উন্নতিই এখন তার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। অথচ এই নিস্তরঙ্গ স্থির জীবনে থেকে একবারের জন্যেও সে বুঝতে পারেনি, কেটে গেছে পনেরোটা বছর। একদিন যে পথের নিত্যযাত্রী ছিলো সে, সেই পথই আজ তার কাছে অচেনা। ১৫ বছরের মধ্যে একবারো সে এই পথে আসেনি, প্রয়োজনই পড়েনি কখনও। নিজের গাড়িতেই চলাফেরা করে সে সবসময়। এই পনেরো বছরে যদিও তার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু একই আছে তার সেই বহু পরিচিত যাত্রাপথ। আজ পনেরো বছর পড়েও মানুষ আগের মতো ছুটছে, ভীড় ঠেলে প্রতিদিন যাওয়া আসা করছে, পাল্টে গেছে শুধু মানুষগুলো। কাল রাতের ভয়াবহ ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে অনেকের, অনেকে গৃহহীনও হয়েছে। কিন্তু এই ঝড় একদিনের জন্য তাকে নিয়ে গেছে তার অতীতে। এই ঝড়ের জন্য তৈরি হওয়া পরিস্থিতিই তো তাকে নিয়ে এলো তার পুরনো সেই চেনা পরিবেশে......ঠিক টাইম মেশিনের মতো। যে অতীতের স্মৃতিটুকুও তার মন থেকে মুছে গিয়েছিলো, এক আশ্চর্য টাইম মেশিনের দৌলতে তাই যেন একদিনের জন্য ফিরে এলো তার জীবনে।
৬
বিধাননগর যাওয়ার ট্রেন ধরতে এক নম্বর প্লাটফর্মের কাছে চলে এলেন তিনি। আর আধ ঘন্টার মধ্যে তাকে সল্টলেকে পৌছতে হবে। আজকের ডিলটা হয়ে গেলে তার কোম্পানির এক কোটি টাকা লাভ। এই লাভের পেছনেই তো ছুটছে তার এখনকার যান্ত্রিক জীবন। পনেরো বছর আগের স্মৃতি ভাবতে ভাবতেই ট্রেনে উঠলেন অরিন্দমবাবু। একটা তো স্টেশন তো মাত্র, তাই দরজার কাছেই দাড়ালেন তিনি। সকল যাত্রীর মতো তিনিও অপেক্ষা করছেন ট্রেনটা ছাড়ার......যেভাবে করতেন পনেরো বছর আগে।মুহুর্তের জন্যে হলেও তিনি বুঝতে পারলেন না ট্রেনের অপেক্ষায় কে দাড়িয়ে......পনেরো বছর আগের কলেজছাত্র অরিন্দম নাকি আজকের 'চ্যাটার্জি কনস্ট্রাকশন'- মালিক অরিন্দম চ্যাটার্জি।
আরও পড়ুন
মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে দ্রুতগতিতে ছুটতে শুরু
করল বিস্তৃত জমি দিয়ে। কালো ওভারকোট আর হ্যাট পরা অগ্নিকে এই জনমানবহীন
আলোক
প্রান্তরে খুজে পাওয়া পুলিশের সাধ্য না। পুলিশ যখন হলদিয়া বন্দরে পৌঁছাবে ,
ততক্ষণে হয়তো হিরোইন লেনদেন শেষ করে কালো টাকা নিয়ে অগ্নি তখন কোলকাতার
পথে---- আঁধারের আড়ালে
No comments