একটি দেশের গপ্পো
নেই কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ, তিনদিকে সমুদ্রঘেরা আয়তনে অত্যন্তই ছোট এক উপদ্বীপ আর তিন তিনটি দেশের উপনিবেশ হিসেবে শাসিত হওয়া একটি দেশ মাত্র ২৫ বছরের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বের থেকে পরিণত হয়েছিল এক উন্নত প্রথম বিশ্বের দেশে । শুধু অর্থনীতি নয়, প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে উন্নয়নের যে কোনো সূচকেই দুনিয়ার প্রথম সারিতে । সেই গল্পের মতো সত্যি ঘটনা নিয়েই……
একটি দেশের গপ্পো
| সিঙ্গাপুরের মানচিত্র |
তিনদিক
সমুদ্রে ঘেরা, মালয় উপদ্বীপ-এর দক্ষিণতম অংশটি বন্দর ও নৌঘাটি নির্মানের জন্য একেবারে
আদর্শ । তাই দখলের পর ব্রিটিশরা এখানে গড়ে তুললো এক শক্তিশালী নৌঘাটি আর বন্দর।
অবস্থানের কারনেই ব্রিটিশ অধিকৃত সিঙ্গাপুর হয়ে উঠলো বিশ্বের এক অন্যতম প্রধান
নৌঘাটি। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দখল শুরু করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তখন
ব্রিটিশদের উপনিবেশ। তাই দুই শক্তিশালী দেশের যুদ্ধ হয়ে উঠলো ভয়াবহ। কিন্তু জাপান
বিমান বাহিনী আর নৌবাহিনীর কাছে প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশদের পরাজয় ঘটতে
লাগলো। চীন থেকে শুরু
করে ভিয়েতনাম, একে একে সব হাতছাড়া হতে লাগলো ব্রিটিশদের। কিন্তু সিঙ্গাপুর নিয়ে
নিশ্চিন্ত ছিলো ব্রিটিশরা। থাকারই কথা, কারন সিঙ্গাপুরের
তিনদিকে তিনটি ফোর্ট বা কেল্লায় বসানো আছে তিনটি ১৫ ইঞ্চি কামান, যা তখনকার দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী আর
সবচাইতে বেশি পাল্লার কামান। ফোর্ট সিলোসো, ফোর্ট ক্যানিং
আর ল্যাব্রাডর সমুদ্রের পারের তিনটি দূর্গেই কামানগুলি ছিলো সমুদ্রের দিকে মুখ
করে। ফলে যুদ্ধজাহাজগুলির সিঙাপুরের কাছে আসা একেবারেই অসম্ভব। এছাড়াও সিঙ্গাপুরে
ব্রিটিশদের শক্তিশালী বিমানঘাটিও ছিলো, আর ছয় মাস যুদ্ধ
চালানোর মতো রসদও সঞ্চিত ছিলো। জাপানিরাও জানতো এই ব্যাবস্থা, তাই ব্রিটিশদের হারিয়ে মালয় পর্যন্ত দখল করে নিলেও জাপান সিঙ্গাপুরের
দিকে অগ্রসর হয়নি। জাপানের সমস্ত যুদ্ধবিমান আর যুদ্ধজাহাজ একত্রে এলেও যে
সিঙ্গাপুরের কোনো ক্ষতি করা সম্ভব না তা উভয়ই জানতো। কিন্তু সুরক্ষিত সিঙ্গাপুরের
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও হার মানতে হলো জাপানিদের কৌশলের কাছে। বিমান আর নৌ বাহিনীর
বদলে জাপানের পদাতিক সৈন্য প্রবেশ করলো সিঙ্গাপুরে, তাও
উত্তরের একমাত্র স্থলসীমা মালয়েশিয়া দিয়ে সাঁতরে জহর নদী অতিক্রম করে। কার্যত
বিনাযুদ্ধেই সিঙ্গাপুর দখল করে নিলো জাপান, ব্রিটিশদের
বদলে জাপানের উপনিবেশ হয়ে উঠলো সিঙ্গাপুর।
ইংরেজ সেনাবাহিনীতে
কাজ করা যুদ্ধবন্দি ভারতীয় সেনাদের নিয়ে বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে গঠিত হলো
আজাদ হিন্দ ফৌজ। রাসবিহারী তখন জাপানের নাগরিক ও তীব্র ব্রিটিশবরোধী হিসেবে পরিচিত। তাই জাপান সরকার তাকে
সবরকম সহায়তাই করেছিলো, কিন্তু বয়সের ভারে তিনি ক্লান্ত।
তাই দরকার ছিলো একজন এমন নেতার যিনি এই বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে পারবে। আর এই
দায়িত্ব নিতেই বার্লিন থেকে সিঙ্গাপুরে এলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। নেতাজির
নেতৃত্বে এই সিঙ্গাপুরেই গঠিত হয় ভারতবর্ষের প্রথম সরকার, নাম আজাদ হিন্দ সরকার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সিঙ্গাপুর আবার ইংরেজদের অধীনে আসে। এইসময় সারা
পৃথিবীতেই উপনিবেশ বিরোধী মতবাদ বৃদ্ধি পায় ও একের পর এক দেশ ইংরেজদের অধীন থেকে
মুক্ত হতে থাকে। ১৯৪৬ সালে সমগ্র মালয় উপদ্বীপ স্বাধীনতা পেয়ে মালয়েশিয়া গঠিত হয়,
আর সিঙ্গাপুর যুক্ত হয় মালয়েশিয়ার সাথে। ব্রিটিশ, জাপানীদের পরে মালয়দের শাসনে শাসিত হতে থাকে দেশটি। দেশটির প্রকৃত
স্বাধীনতা আসে ১৯৬৫ সালে এবং লি কুয়ান ইউ এর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন।
লি কুয়ান
ইউ-এর নেতৃত্বেই সিঙ্গাপুরের উত্থান শুরু হয়। লি কুয়ান প্রথমেই একটি দক্ষ ও যোগ্য
প্রশাসন গড়ে তোলেন, এরপরেই শুরু করেন কঠোর আইনের শাসন। আইন সকলের জন্যই সমান এর যথার্থ
প্রয়োগ হয় সিঙ্গাপুরেই যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজেরও কোনো অতিরিক্ত ছাড়ের সুযোগ
নেই । আর এভাবেই সিঙ্গাপুর পরিণত হয় একটি অপরাধ ও দূর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে। এরপরেই লি নজর দেন অর্থনীতির দিকে।
জমির অভাবে কৃষিকাজের সুযোগ নেই কোনো, খনিজ সম্পদের অভাব
শিল্পের সম্ভাবনাকেও নস্যাত করে। অগত্যা সিঙ্গাপুর একরকম বাধ্য হলো সার্ভিস
সেক্টরের দিকে ঝুকতে। নেওয়া হলো নতুন অর্থনৈতিক উদারনীতি, ঊন্মুক্ত হলো বাজার। শুরু হলো আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল
তৈরি। গড়ে তোলা হলো বিশাল এক বন্দর ও এক বিমানবন্দর। নতুন নীতি আর স্বচ্ছ প্রশাসন
ডেকে আনলো অসংখ্য বিনিয়োগকারী আর একের পর বাণিজ্যিক সংস্থার সদর দপ্তর স্থাপিত হতে
লাগলো সিঙ্গাপুরে। ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় সারা পৃথিবীতে সার্ভিস সেক্টরের রমরমা শুরু
হলে সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি চরমে ওঠে। মাথাপিছু আয়ে সিঙ্গাপুর পৃথিবীর
প্রথমদিকের দেশে পরিণত হয়। আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারের
প্রচুর ব্যয় সিঙ্গাপুরকে অন্যতম সেরা দেশে পরিণত করে। শুধু শিক্ষা ও
স্বাস্থ্যই নয়, অন্যান্য পরিকাঠামো ও নগর পরিকল্পনায়ও এই দেশ অগ্রগণ্য। অত্যাধুনিক
গণপরিবহন ব্যবস্থা, সকলের জন্য বাসস্থান ও পরিবেশ উন্নয়নে সিঙ্গাপুর এক অনন্য
নাম।
১৯৯০ সালে লি কুয়ান ইউ যখন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন, তখন সিঙ্গাপুর পৃথিবীর অন্যতম এক অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং Alpha+ Global City হিসেবে খ্যাত। এশিয়ার বিগ ফোর-এর মধ্যে প্রথম নামটিও এই দেশেরই।
সিঙ্গাপুরের কঠোর আইন ও তার নিরপেক্ষতা দুনিয়ার সামনে আসে যখন ১৯৯৪ সালে মাইকেল ফ্যা নামের এক আমেরিকান যুবক একটি সিঙাপুরের একটি গাড়িতে দাগ কাটে। অন্যের গাড়িতে দাগ কাটার জন্য তার শাস্তি হয়। তখন তাকে মুক্ত করতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সিঙ্গাপুরের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু কোনো চাপেই সিঙ্গাপুর মাথা নত করেনি।
আজও সিঙ্গাপুর পৃথিবীর সব বড়ো সংস্থাগুলির প্রথম পছন্দের স্থান। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন সবকিছুতেই সিঙ্গাপুর প্রথম সারির দেশ হলেও গণতন্ত্র, মত প্রকাশ ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এই তিনটিতে এর মান খুবই খারাপ। হয়তো সবকিছুতেই ভালো কেউ হতে পারে না, কোনো একটা দূর্বলতা থেকেই যায়।