মিতালী চক্রবর্তী
ঘড়িতে
তখন সকাল 10 টা প্রায়, রান্নার পাট চুকিয়ে গৌরী দেবী ড্রইংরুমে এসে
দেখেন প্রীতি চুপ করে বসে আছে আর একমনে কিছু একটা ভেবে চলছে বাইরের দিকে
চেয়ে। গৌরী দেবীই হাঁক দিলেন
-
কিরে, বসে আছিস এখনও? যা তৈরি হয়ে নে, বেলা তো 10 টা বেজে গেলো, নয়নার
আশীর্বাদের সময় হয়ে এসেছে, আর তুই এখনও তৈরি হস নি? তৈরি-টৈরি হয়ে
নয়নার বাড়ি পৌঁছতেও তো সময় লেগে যাবে।
- আমি যাবো না মা ওর আশীর্বাদে।
-
সে কি? তোর এত্ত ভালোবন্ধু নয়না, এত করে বলে গেলো যে আশীর্বাদ, গায়েহলুদ,
বিয়ে, সবেতেই যেনো তুই যাস... কত্তদিন ধরে তুই ওর বিয়েতে যাবার জন্য
কেনাকাটাও করলি, আর এখন শেষ মুহূর্তে বলছিস যাবি না?
- উফফ মা, আমার ভালো লাগছে না। আমি যাবো না ব্যাস।
এই বলে প্রীতি নিজের ফোন নিয়ে আনমনেই ফোন ঘাটাতে লাগল।
গৌরী
দেবী মেয়ের কথায় আহত হলেও চুপ করে থেকে শুধু ভাবছিলেন প্রীতি তো এমন
মনমরা ছিল না কখনো, কতো প্রাণোচ্ছ্বল ছিল মেয়েটা, কিন্তু এখন কি রকম রুক্ষ
ব্যাবহার মেয়ের, কিন্তু এইভাবে মনমরা হয়ে বসে থাকলে কি সমস্যার সমাধান
হবে? মা হয়ে আমি দেখতেও পারি না ওকে এত অবসাদগ্রস্ততায়।
তখুনি হটাৎ প্রীতির ফোন রিং হাওয়াতে গৌরী দেবীর ভাবনায় ছেদ পড়ে। প্রীতি দেখলো নয়নার ফোন।
- হ্যাঁ বল (খুব স্ফীতকণ্ঠে বলে উঠলো প্রীতি)
- কি হ্যাঁ বল? কখন আসবি রে? যখন পাত্রপক্ষ আশীর্বাদ সেরে চলে যাবে তখন আসবি নাকি?
- আমি আসবো না নয়না, শরীর ভালো নেই রে....
- শোন, এইসব বাজে বকবক না করে তৈরি হয়ে আয় জলদি। না এলে আর কথা বলবি না আমার সাথে কোনোদিন মনে রাখিস।
- আরে নয়না, শোন তো...কথাটা তো শোন...
কথা
শেষ হবার আগেই কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে নয়না ফোন কেটে দেয়। প্রীতি ফোন রেখে
আবার চুপ করে বসে রইলো ব্যাজার মুখে। গৌরী দেবীই নিস্তব্ধতা ভাঙলেন।
- প্রীতি তোর যাওয়া উচিত, তোর বিয়েতে নয়না তোর ছায়াসঙ্গী হয়ে রয়েছিল, তুই ভুলে গেছিস?
এইবার প্রীতি চোখ তুলে চাইল। প্রীতির চোখ ভরা জল, কাঁপা গলায় বলল
-
মা এই কথাটাই তো বারবার মনে পড়ছে যে আমার বিয়েতে নয়না সর্বক্ষণ আমার
সাথেসাথে ছিলো, কিন্তু মা আজ তো আমার নিজের বিয়েই ভাঙতে বসেছে, কি করে যাই
বলো? আমি তো অপয়া...
প্রীতি অঝোরে কেঁদে চলছে তখন।
গৌরী
দেবী মেয়েকে কি স্বান্তনা দেবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না! বারবার মনে পড়ে
যাচ্ছিল প্রীতির বিয়ের কথা, ধুমধাম করে ওদের বিয়েটা হয়েছিল। গৌতম যথেষ্টই
সুপুরুষ, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো আর প্রীতিও খুশি ছিল খুব কিন্তু বিয়ের
কিছু সময় পর থেকেই দুজনের মধ্যে সৃষ্টি হয় দূরত্বের যার ফলে আজ প্রীতি
বিচ্ছেদ চাইছে গৌতম থেকে। এত বোঝানোর পরও প্রীতি নিজের কথায় অনঢ়, কিন্তু
মনের সুখে কি আছে আদৌ গৌতম কে ছেড়ে? প্রীতি তখনও কেঁদে চলছে। গৌরী দেবী
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে স্বান্তনা দিতে দিতে বললেন
-
এসব কুলক্ষনে কথা মুখেও অনবি না। তুই মোটেও অপয়া নস। আর যদি চাস যে নয়নার
সাথেও তোর বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ না ঘটুক তবে এখুনি তৈরি হয়ে ওর বাড়িতে যা।
- কোথায় ছিলেন আপনি মহারানী? আসুন পদধূলি দিন। (ব্যাঙ্গ করে নয়না বলে উঠে প্রীতি কে)
- আরে না, তেমন কিছু না। (মুখে বললেও, প্রীতির মনে কোনো আনন্দের রেশ নেই)
যথাসময়ে
নয়নার আশীর্বাদ হয়ে গেলো। ঘর ভর্তি লোকজন, নয়নাও ব্যাস্ত সকলের সাথে
কথাবার্তায়। প্রীতি যেনো হাঁপিয়ে উঠছিল এই পরিবেশে। থেকেথেকে ওর মন আরো
বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠছিল যেন, তার উপর মঞ্জু আন্টি (নয়নার মা)
প্রীতিকেই দায়িত্ব দিলেন বিয়ের আগে নয়না কে বিউটি পার্লারে নিয়ে যেতে।
প্রীতি আজ সকাল সকাল চলে এসেছে, নয়নার সাথে পার্লারে যেতে হবে বলে। দু বান্ধবী একসাথে গাড়িতে বসে পড়ল।
নয়নাই কথা শুরু করে
- প্রীতি এরকম মনমরা হয়ে আছিস কেন বল?
- তুই তো সবই জানিস, সব বান্ধবীরা সামনে কিছু না বললেও পিঠপিছে আমায় নিয়ে কত কি জানি বলে।
-
না রে, কেউ কিছু বলে না, কারোর এত মাথাব্যাথা নেই প্রীতি, বুঝতে শেখ এবার।
সবাই যে যার নিজের জীবন নিয়ে ব্যাস্ত, তোকে নিয়ে কে ভাবতে বসবে বল? আমি
এখনও বলছি প্রীতি, সব মিটমাট করে নে গৌতমের সাথে... ওকে ছেড়েও তো তুই ভালো
নেই।'
- এত সেয়ানা হলি কবে নয়না?
-
সেয়ানার কথা নয়, বিয়েটা ছেলেখেলা নয় রে। না গৌতম তোকে মারে, না মদে মাতাল
হয়ে থাকে, না মেয়েবাজি করে তবুও তুই ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিস।
-
নয়না, আগে বিয়ে কর। তারপর বুঝবি যখন দিনের পর দিন বর কাজ কাজ, অফিস অফিস,
মিটিং মিটিং করে পাগল হবে, তুই বসে থাকবি বরের সাথে সময় কাটানোর জন্যে আর
পরিবর্তে সারাদিন অপেক্ষা করেই থাকতে হবে।
- প্রীতি কাজ তো তোর জন্যেই করছে গৌতম, তোকে ভালো রাখতেই তো করছে,আর কারোর জন্যে করছে কি?
(বিয়ের দিন) প্রীতি সেদিন থেকে বারবার নয়নার কথা গুলো ভাবছে! 'তবে কি নয়না সত্যি বলছে? আমি এই কি বেশি রিয়েক্ট করে ফেলেছি?'
তখনি কেউ একজন হাঁক-ডাক জুড়ে দিল
- কই গো সবাই? দেখো দেখো বর এসেগেছে বর এসেগেছে...
হটাৎ
বর আসার আগমণ বার্তায় চিন্তায় খেদ পরলো প্রীতির। সবার সাথে প্রীতিও গেলো
বর দেখতে। কিন্তু একি গৌতম দাঁড়িয়ে আছে নয়নার হবু বর সুদীপের পাশে...
বিহ্বলের মতো চেয়ে রইলো প্রীতি।
মালা বদলের গান
বাজছে, চারিদিকে কি মনোরম পরিবেশ, নয়না মালা বদল করছে কিন্তু প্রীতির
সেদিকে ধ্যান কোথায়? সে দুচোখ ভরে গৌতমের দিকেই চেয়ে আছে, তা দেখে গৌতম
কাছে এসে খুব শান্তস্বরে বললো
- তোমায় খুব সুন্দর দেখাচ্ছে প্রীতি।
প্রীতি বোধহয় একটু লজ্জা পেলো, কিন্তু সহসা নিজেকে সামলে বললো
- তুমি এখা...??
কথা শেষ না হতেই গৌতম বললো
- আমি সুদীপের বন্ধু,তাই...
ওদিকে বিয়ের রীতি নীতি শুরু হয়ে গেছে, সবাই নবদম্পতি কে আশীর্বাদ দিচ্ছেন। আর গৌতম ও প্রীতি একটু দূরে একান্তে বসে,
- তুমি ভালো আছো প্রীতি?
প্রীতি নিশ্চুপ।
- তোমায় যে এখনও অনেক ভালোবাসি, সব ভুল বোঝাবোঝি গুলোর ইতি দিয়ে এই শুভ লগনে বিয়ের মণ্ডপে আরেক বার আমায় বিয়ে করবে প্রীতি?
প্রীতি
অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে গৌতমের দিকে। গৌতম চোখের ভাষায় আমন্ত্রণ দিচ্ছে
প্রীতি কে নতুন করে জীবনের শুভ সূচনা করার জন্য। বিয়ের মণ্ডপ থেকে তখন
ভেসে আসছে উলুধ্বনি আর শঙ্খনাদ, আর একান্তে নীরবতার ধ্বনিতে প্রণয়ের কথা
হচ্ছে ওদের দুজনার মধ্যে...
No comments