Header Ads

Header ADS

রাজপথের ইতিবৃত্ত


বাস,ট্রাম,গাড়ি,নৌকা থেকে শুরু করে ঘোড়া, মাছ সবই চলে বেরিয়েছে এর মধ্য দিয়ে। দুধারে তীর,পরিখা থেকে শুরু করে ফুটপাথ,ড্রেন পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। বহু আন্দোলন,বিপ্লব,দূর্ঘটনা আজও নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে। সেই আশ্চর্য্য গল্প নিয়েই অবসরের পাতায়..রাজপথের ইতিবৃত্ত


                                    শীর্ষক দত্ত


পশ্চিমে নদী, দক্ষিণে জঙ্গল এই নিয়েই তিনটি গ্রাম হয়ে উঠছে এক ব্যবসাকেন্দ্র। একদল ইংরেজ বণিক বহু কষ্টে অনুমতি পেয়েছে বানিজ্য করার, তাও রাজধানী থেকে প্রায় ১২৬ মাইল দক্ষিণের এক প্রত্যন্ত স্থানে। তাতে কি হয়েছে তাদের কোম্পানির নাম ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তারা নিজেরাই প্রত্যন্ত জনপদকে এক নগরে পরিণত করে নেবে যেখানে ব্যবসার বাজার অনুকূল আর বাসিন্দারা তাদের অনুগত।কিন্তু সমস্যা ছিলো দুটি, সরকারের সাথে তাদের সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। রাজ অনুগ্রহ না থাকলে যে ব্যবসা করা অসম্ভব তা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অভিজ্ঞ বণিকদের অজানা নয়। ফলত নবাবকে তুষ্ট রাখতে তারা মরিয়া, উপহার থেকে কূটনীতি, স্তাবকতা থেকে ষড়যন্ত্র কোনো কিছুই বাকি ছিলো না। কিন্তু অপর সমস্যাটি আরও ভয়ানক, দস্যুর আক্রমন। ১৭৪১ সাল থেকে শুরু হলো মারাঠা সাম্রাজ্যের মদদপুষ্ট দস্যুদের আক্রমন, তাদের পোশাকি নাম বর্গী। তারা প্রতিবছর নিয়ম করে আসতো, আর ধন-সম্পদ লুঠ করে নিয়ে চলে যেত। বর্গীদের হানায় ভেঙ্গে পড়তে শুরু করলো কোলকাতার অর্থনীতি। দস্যুদের সাথে তো কুটনীতি চলে না। কোলকাতায় তাদের নিজস্ব দূর্গ “ফোর্ট উইলিয়াম” ও সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও তা কোনো বিদেশী সাম্রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্ত দস্যুদের মোকাবিলার জন্য কিছুই নয়। অগত্যা শুরু হলো নবাবের সাহায্য প্রার্থনা। কিন্তু ভাগ্য এমনই নবাবও বর্গীদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলেন। রাজসরকারের দুর্বলতা যে কখনও কখনও সৌভাগ্যের হয় তা বোধহয় ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকরা বুঝতেই পেরেছিলো। আর তাই দূর্বল নবাবের থেকে অধিক সুবিধা আদায় করা হয়ে গেল খুবই সহজ। কিন্তু বর্গীদের তো নিয়ন্ত্রন করতে হবে। নবাবের সম্মতিতেই বর্গী দমনের উদ্দেশে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৈরি করলো নিজস্ব সেনাবাহিনী। কিন্তু তারা ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, শুধুমাত্র বলপ্রয়োগ নয়, কৌশলে অধিক বিশ্বাসী। তাই শুরু করল কোলকাতাকে সুরক্ষিত করার কাজ। কোলকাতার পশ্চিমদিক সুরক্ষিত নদী দিয়ে আর উত্তরে চিৎপুর খাঁড়ি। খোলা শুধু দক্ষিণের জঙ্গল আর পুর্বের জনপদ, বর্গী আক্রমনও ঘটছে পূর্বদিকে। অগত্যা শুরু হলো বাকি দুইদিক সুরক্ষিত করার কাজ, ১৭৪২ সালে চিৎপুর খাঁড়ি থেকে পূর্বদিক বরাবর শুরু করে দক্ষিন দিক হয়ে নদী পর্যন্ত কাটা হলো এক চওড়া পরিখা। আর এই পরিখা যে নিজেই হয়ে উঠবে এক ইতিহাস তা বোধহয় কেউই বোঝেনি সেদিন।



মারাঠা বর্গীদের  হাত থেকে বাচতে এই পরিখার জন্ম, তাই জন্ম থেকেই এর নাম হয়ে গেলো “Maratha Ditch” বা “মারাঠা পরিখা”। কিন্তু একে পরিখা না বলে খাল বলাই ভালো। ১৭৫২ এর পর বর্গী

মারাঠা পরিখাঃ পুরোনো কোলকাতার ম্যাপে

প্রভাব কমতে থাকে, ততোদিনে ইংরেজ বাহিনীও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে অনেক। ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের পরিমান বেরেছে অনেক, কোলকাতাও একটি নগর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।  বর্গী ভীতি দূর হলে এই খাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। নগরের অভ্যন্তরীন পরিবহন ও নিকটবর্তী জনপদগুলোতে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নৌকা চালানো শুরু হয়। বিভিন্ন ব্যক্তিগত নৌকা এমন কি ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিচালিত নৌকাও যাত্রী ও পণ্য পরিবহন শুরু করে। ক্রমে এই খাল হয়ে ওঠে কোলকাতার পরিবহনের প্রধান পথ।

 মারাঠা বর্গীদের আক্রমন থেকে এই খাল কোলকাতাকে রক্ষা করলেও নতুন নবাবের হাত থেকে পারেনি। ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা প্রায় ৩০০০০ সৈন্য নিয়ে কোলকাতা আক্রমন করেন ও এই খাল অতিক্রম করে লালদীঘির যুদ্ধ শুরু করেন। ইংরেজরা পরাজিত হলে কোলকাতা দখল করেন। তার পরের ইতিহাস তো সবারই জানা। পলাশির যুদ্ধের পর কোলকাতার গুরুত্ব হঠাৎই বেড়ে যায়। ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আয় অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে, আর কোলকাতা নগর থেকে মহানগরে পরিনত হতে শুরু করে। খালের প্রয়োজন কমতে থাকায় সেটিকে বুজিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ১৭৯৯ সালে তা বুজিয়েও ফেলা হয়।

 

খালের অস্তিত্ত্ব হারিয়ে গেলেও তার গুরুত্ব তো এতটুকুও কমেনি, বরং আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়ে যায়। চওড়া খালের পরিবর্তে নির্মিত হয় এক চওড়া রাস্তা, জলপথের পরিবর্তে রাজপথ। তখন বালিগঞ্জ, মানিকতলা, রাজাবাজার, বাগবাজার হলো শহরতলী, আর এই রাজপথ হলো পুর্বের বাইপাস। সময়ের সাথে সাথে এই পথে গাড়ির সংখ্যা

আজকের এজেসি বোস রোড
বাড়তে লাগলো, এই পথকে কেন্দ্র করে তার দুইপাশে তৈরি হতে লাগলো জনবসতি। এই পথ তখন আর বাইপাস রইলো না, হয়ে উঠলো শহরের মূল রাজপথ। রাস্তাটির নাম দেওয়া হলো সার্কুলার রোড, উত্তর অংশের নাম আপার সার্কুলার রোড আর দক্ষিণের অংশের নাম লোয়ার সার্কুলার রোড। শ্যামবাজার থেকে শুরু করে হেস্টিংস পর্যন্ত উল্টোনো “
L” আকৃতির প্রায় ১০কিমি লম্বা রাজপথ। ধীরে ধীরে এই পথের ধারেই স্থাপিত হতে থাকে স্কুল, সরকারী অফিস, হাসপাতাল, আবাসন, দোকান এবং আরো কত কি! এই পথে লোক চলাচলও বাড়তে থাকে।

১৮৭৩ সালে আপার সার্কুলার রোড ও লোয়ার সার্কুলার রোডের সংযোগস্থলে তৈরি করা হয় একটি ট্রাম ডিপো, নাম দেওয়া হয় শিয়ালদহ। এই শিয়ালদহ থেকেই প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলতে শুরু করে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৪কিমি পথে। ১৮৭৮ সালে শিয়ালদহ ট্রাম ডিপো সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় রাজাবাজারে আর শিয়ালদহে চালু করা হয় রেল স্টেশন। শিয়ালদহ রেল স্টেশন চালুর পর থেকেই সার্কুলার রোডের ব্যস্ততা তুঙ্গে ওঠে। এই রাস্তাতেও পাতা হয় ট্রামলাইন, চালু হয় বাসরুট। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে সারাদেশে ইংরেজ বিরোধী মনোভাব প্রকাশিত হয়। দিনের পর দিন এই পথে চলতে থাকে অবরোধ,সংঘর্ষ। সময়ের সাথে সাথে সার্কুলার
শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ঃ এপিসি রোডের শুরু
রোডের ছন্দ বদলালেও কমেনি তার ব্যস্ততা, হয়তো ব্যস্ততাই তার ছন্দ।


কিন্তু সার্কুলার রোডও একদিন স্তব্ধ হয়ে যায়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ হয় পরিখা যাতে বিমানহানার সময় মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। যুদ্ধ চলছিলো, ১৯৪৩ সালে জাপান বাহিনী বার্মা পর্যন্ত দখল করে নেয় ইংরেজদের হাত থেকে। তাদের লক্ষ্য এবার কোলকাতা। জাপানি বিমানহানার ভয়ে কোলকাতা হয়ে পড়ে জনশূণ্য। অন্যান্য রাস্তার মতোই সার্কুলার রোডের দুধারে খোড়াধের পরে ঘটে যাওয়া ১৯৪৬ এর দাঙ্গারও সাক্ষী এই রাজপথ। 



স্বাধীনতার পরও এই রাজপথের ইতিহাস একইরকম, বহু আন্দোলন আর অবরোধের সাক্ষী। সরকার এই রাস্তার নাম বদলের সিদ্ধান্ত নেয়। আপার সার্কুলার রোডের নাম হয় আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড এবং লোয়ার সার্কুলার রোডের নাম হয় আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোড। আজও এই রাস্তা কোলকাতার ব্যস্ততম পথ হিসেবে নিজের মর্যাদা ধরে রেখেছে। এই পথের ওপরই ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল, রবীন্দ্র সদন, নন্দন, পিজি হাসপাতাল, এজেসি বোস কলেজ, শিয়ালদহ স্টেশন, অনেক স্কুল, দামী হোটেলসহ আরও কত কি। কোলকাতার দ্বিতীয় দীর্ঘতম উড়ালপুল প্রায় ৩কিমি দীর্ঘ A.J.C. Bose Flyover এই আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোডের ওপরই অবস্থিত। কোলকাতায় এসেছে অথচ আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোড বা আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোডে যায়নি এরকম মানুষ খুব কমই আছে। যারা কোলকাতা বা তার শহরতলীর বাসিন্দা তারা তো সকলেই এই দুটি রাস্তার নাম জানে, কিন্তু এই দুটি রাস্তার ইতিহাস কতটা জানে আমার জানা নেই।


ম্যাপে আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু রোড এবং আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড



Theme images by saw. Powered by Blogger.