Header Ads

Header ADS

এক শিল্পপতির কাহিনী


বিশ্বের প্রথম অর্থনীতি ছিলো কৃষিনির্ভর। সেখান থেকে ক্রমে অর্থনীতির ভরকেন্দ্র চলে গেলো উৎপাদন (production) শিল্পের হাতে আর বর্তমানে সেবা ক্ষেত্র (service sector).  কিন্তু এই নিয়ম ভেঙ্গেই যিনি কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে স্থাপন করেছিলেন একাধিক সার্ভিস ইন্ডাষ্ট্রি, তাও উনবিংশ শতাব্দীর এক ইংরেজ উপনিবেশে আর হয়ে উঠেছিলেন প্রথম ভারতীয় শিল্পপতি। 






 শীর্ষক দত্ত
           

ভারতবর্ষে তখন সাম্রাজ্য বিস্তারের দিন। রাজধানী কোলকাতা থেকে হচ্ছে নিত্যনতুন পরিকল্পনা, সম্পদের নিরবিচ্ছিন্ন আগমনে কোলকাতা হয়ে উঠছে প্রাচুর্যময়। ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে ইংরেজদের অভিবাসন ঘটছে ভারতের মাটিতে। কেউ বা ভাগ্যের অন্বেসনে, কেউ বা অর্থের লোভে, কেউ বা নিছক আডভেঞ্চারের নেশায়। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো আর সবচেয়ে ঊর্বর জমির দেশের মালিকানা তখন তাদের হাতে। ইংরেজদের জন্য সে এক অভূতপূর্ব সুযোগ, যারাই ভারতবর্ষে আসছে খুব সহজেই হয়ে যাচ্ছে প্রচুর সম্পদের মালিক। আর এইরকম সময়েই শিল্প স্থাপন করে ধনী হয়ে উঠেছিলেন এক ভারতীয়, ব্রিটিশদের থেকে আদায় করে নিয়েছিলেন প্রিন্স উপাধি, তিনিই দ্বারকানাথ ঠাকুর, ভারতের প্রথম শিল্পপতি।


দ্বারকানাথ ঠাকুরের জন্ম ১৭৯৪ সালে কলকাতার ঠাকুর পরিবারে। তখন ঠাকুর পরিবারের খ্যাতি তেমন ছিলো না বললেই চলে। দ্বারকানাথ পরিবারের উদ্যোগেই ছোটবেলা থেকেই সাহেবদের ত্বত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহন শুরু করেন, ক্রমেই সাহেব শিক্ষকদের মন জয় করে ফেলেন। রবার্ট গুটলার ফারগুসন নামক একজন ব্রিটিশ আইনজীবীর অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে দ্বারকানাথ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কিত আইন এবং কোলকাতা সুপ্রিম কোর্ট, সদর ও জেলা আদালতের যাবতীয় আইন ও কার্যপ্রণালী বিষয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সফলভাবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। কাকা রামলোচনের মৃত্যুর পরে ষোলো বছর বয়সে দ্বারকানাথ তাঁর সম্পত্তি, কলকাতার জমি-বাড়ি এবং মফসসলের জমিদারির মালিক হয়ে উঠেন। সেই সময় জমিদারি থেকে আনুমানিক বার্ষিক তিরিশ হাজার টাকা আয় হতো।  


১৮২৮ সালে তিনি সেরেস্তাদারের চাকরি লাভ করেন । পরবর্তী সময়ে লবণ ও আফিমের আবগারি বোর্ডে দেওয়ানের পদ লাভ করে বারো বছর দেওয়ানের চাকরি করেন।

প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর

অর্থের স্বচ্ছলতা যথেষ্ট থাকলেও মনের পরিপূর্ণতা বোধহয় একদমই ছিল না। জমিদারি নয় নিজের কোনো ব্যবসার ইচ্ছে তার বরাবরই ছিলো।সেই ইচ্ছেপূরণ করতেই তিনি হঠাৎ খুলে বসলেন নিজের কোম্পানি, JOINT STOCK COMPANY. আজকের এই অত্যাধুনিক যুগে স্টার্ট-আপ এর রমরমা হলেও সেই স্টার্ট-আপই কিন্তু দ্বারকানাথ ঠাকুর খুলে ফেলেছিলেন আজ থেকে প্রায় ২০০বছর আগে। নিজের কোম্পানির জন্য যোগাড়ও করে ফেলেছিলেন বেশ কিছু বিনিয়োগকারী। চাকরি করার সময় থেকেই তিনি নিজে বিনিয়োগে উৎসাহী হয়ে উঠেন।  লবণ প্রস্তুতিতে করেন প্রথম বিনিয়োগ। পরে অর্থ লগ্নি করে  মহাজনি ব্যবসায় যার ফলে তিনি তাঁর সহকর্মী ও সমসাময়িক অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের অসন্তোষের শিকার হন। ঘটনাক্রমে একবার দ্বারকানাথকে এ জন্য অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু যথাযথ প্রমাণের অভাবে তিনি কোর্ট থেকে সসম্মানে অব্যাহতি লাভ করেন। মহাজনি ব্যবসা ছাড়াও তিনি বিখ্যাত ম্যাকিনটশ অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে রপ্তানি বাণিজ্যে মূলধন বিনিয়োগ করেন।



ইংরেজরা এদেশে এসে অনেক ধনী হয়ে উঠলেও তাদের জীবনযাত্রার মান ইংল্যান্ডের মতো আনন্দদায়ক ছিলো না। এর প্রধান কারন ছিলো কোলকাতার বিনোদনের উপকরণ কখনই লন্ডনের মতো নয়। এটা লক্ষ্য করেই দ্বারকানাথ ভাবলেন নতুন ব্যবসার কথা। তিনি একের পর এক প্রস্তুত করলেন ক্লাব, থিয়েটার আর আয়োজন করতে লাগলেন একের পর এক প্রাশ্চাত্য অনুষ্ঠান ও পার্টির। বলা বাহুল্য, তার সম্পদের পরিমাণ ফুলে ফেপে উঠতে লাগলো। তখন কোলকাতায় অর্থনৈতিক লেনদেনের কোনও সগঠিত ব্যবস্থা ছিলো না। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিজস্ব ব্যাংক থাকলেও ভারতীয়দের একমাত্র অবলম্বন ছিলো জমিদারের খাজাঞ্চিখানা। দ্বারকানাথ ঠাকুর নিজে দেশীয় ব্যাঙ্ক তৈরিতে তৎপর হয়ে উঠেন আর ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিয়ন ব্যাংকের। ইউনিয়ন ব্যাংকই হলো প্রথম সম্পূর্ণ ভারতীয় আধুনিক ব্যাংক। আসামের বাগানে চা আবিষ্কারের বছরদশেক পরে ১৮৩৪ সালে লর্ড বেন্টিংক যখন চায়ের ব্যবসার অনুমোদন দেন, দ্বারকানাথ অমনি চা-শিল্পে নেমে পড়েন। বাগিচা-শিল্পের প্রযুক্তিকে এভাবেই তিনি দুহাতে স্বাগত জানান। তিনিই আসামের চা প্রথম কলকাতায় এনে ইংল্যান্ডে রফতানি করেন। কিন্তু রানীগঞ্জের কয়লাখনি কিনে তার সম্পদ আহরণের দৃষ্টান্ত দেশীয়দের মধ্যে দ্বারকানাথই প্রথম স্থাপন করেছিলেন। তিনি যখন এ-খনি কেনেন, তার এক বছরের মধ্যে তার উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে যায়। তারপর তা চক্রবৃদ্ধি হারের মতো বাড়তে থাকে।


 
বেলগাছিয়া ভিলাঃ ইংরেজদের কাছে পারফেক্ট প্যারাডাইস

শিল্পের ও ব্যবসার দিকে তিনি যথেষ্ঠ বিচক্ষণ হলেও ব্যক্তিগত জীবণে তিনি ছিলেন ঠিক উল্টো। অত্যধিক ব্যয় আর বিলাস জীবণ-যাপনের জন্য প্রচুর আয় স্বত্ত্বেও তিনি ক্রমশ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। কথিত আছে, তিনি রাণী রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্রের কাছ থেকে দুই লক্ষ টাকা ধার করেন ও পড়ে সেই টাকা শোধ করতে না পেড়ে রাণী রাসমণিকে অনেক জমি হস্তান্তর করেন। ১৮৪২-এ দ্বারকানাথ তাঁর নিজস্ব জাহাজ ইন্ডিয়ায় চেপে প্রথম বার বিলেত যান। লন্ডনে থাকাকালীন রানি ভিক্টোরিয়া এবং প্রিন্স অ্যালবার্ট-এর সঙ্গে একাধিক বার সাক্ষাৎ হয়। অনেকেই মনে করেন রানির সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই লন্ডনের হাই সোসাইটিতে মেশার প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন দ্বারকানাথ। শোনা যায়, লন্ডনে তিনি এত ব্যয় করেন যে ইংরেজ ধনকুবেররাও আশ্চর্য্য হয়ে যান। ফলস্বরূপ দ্বারকানাথের কপালে জোটে প্রিন্স উপাধি। অক্টোবরে দ্বারকানাথ ইংল্যান্ড থেকে প্যারিসে যান। সেখানে ফ্রান্সের রাজা লুই ফিলিপ তাঁকে সেন্ট ক্লাউডে এক সংবর্ধনা দেন।


দ্বারকানাথের নবলব্ধ আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন ব্যবসাক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে তিনি বহু ব্যক্তি ও কোম্পানির কাছে ঋণী হয়ে পড়েন। এ ঋণের বোঝা তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে বাড়তেই থাকে। পরিণামে তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথকে পিতার ঋণের দায় বহন করতে হয় এবং গোটা পরিবারকে দায়মুক্ত করতেই তাঁর সারাজীবন কেটে যায়। 

কেনসেল গ্রিন

১৯৪৬ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ডে যান আর এবার সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। ৩০ জুন ডাচেস অফ ইনভেরনেস-এর প্রাসাদে নৈশভোজে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার পর ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ১ অগস্ট দ্বারকানাথের মৃত্যু হয় মাত্র ৫১ বছর বয়সে। তাঁর দেহ লন্ডনের কেনসল গ্রিনসামাধিক্ষেত্রে রাজকীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়। কেননা, সে সময় মৃতদেহ দাহ করার প্রচলন লন্ডনে ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্যে ইউরোপীয়দের সঙ্গে সহযোগিতা চলে আসছিল দীর্ঘদিন ধরেই। কিন্তু দ্বারকানাথই প্রথম বাঙালি যিনি ইউরোপীয়দের সমকক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। স্বীয় যোগ্যতাবলে ব্রিটিশ বণিকদের বাণিজ্য জগতে একজন সমান অংশীদার রূপে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে দ্বারকানাথ প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান।











তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার

১) উইকিপিডিয়া

২) আনন্দবাজার পত্রিকা

৩) কালি ও কলম
















আরও পড়ুন

 

বৈদ্যুতিক আলোর আগে গ্যাসের ষ্ট্রীটলাইটই আলোকিত করতো রাতের পথকে, আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিতও কোনও বাতিওয়ালা। বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলনের সাথে সাথে এই বাতিওয়ালারাও কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। শুধু কিছু কবিতা আর রোমান্টিকতাতেই তাদের কথা শোনা যায়। কিন্তু তিনি এই বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানোর কাজই করে গেছেন সারা জীবন ধরে, শুধু করে যাননি বিশ্ববিখ্যাতও হয়েছেন। তার জীবনের নানা অজানা কথা নিয়েই ...























Theme images by saw. Powered by Blogger.