Header Ads

Header ADS

লাল বাড়ির কথা

কর্মীদের আবাস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে সরকারী সদর দপ্তর বহু পরিবর্তন আর ইতিহাসের সাক্ষী এই ভবন। একদিন যে ভবন থেকেই সমগ্র ভারতের ভাগ্য নির্ধারণ হতো, কালের নিয়মে আজ তারই ভবিষ্যত চরম অনিশ্চয়তার মুখে। আর সেই জানা অজানা অনেক তথ্য নিয়েই ....




                                         শীর্ষক দত্ত

বছর ২০ আগের একটি যুদ্ধই বাংলার অর্থনীতি আর রাজনীতির যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। দ্বৈত শাষন ব্যবস্থার ফলে যেমন মুর্শিদাবাদের মত নগরের অবনমন শুরু হয়েছিলো, গঙ্গানদী তীরের জনপদ আর নগরগুলি ধ্বংসের মুখে, তখনই বাংলার তিনটি গ্রাম আর জঙ্গলঘেরা এক স্থানে এক নতুন মহানগরের উত্থান শুরু হলো। ২০ বছরের শোষণের ফলে একদিকে মন্দা আর দূর্ভিক্ষ দেখা দিলো আর অন্যদিকে নতুন গড়ে ওঠা মহানগরে প্রয়োজন হলো অনেক কর্মীর। নিম্নপদস্থ এই কর্মীদের কাজের জন্য তৈরি আবাসন থেকেই শুরু হলো আরেক ইতিহাসের।

নিম্নপদস্থ সরকারী কর্মচারীদের থাকার জন্য ১৭৭৬ সালে এক ভবন নির্মাণের নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হলো টমাস লিওনকে। যে ভবনটি হবে কোম্পানীর সদর ফোর্ট উইলিয়ামের খুব কাছেই। অনেক খুঁজে টমাস লিওন শেষপর্যন্ত পছন্দ করলেন কোম্পানীর
অতীতের রাইটার্স বিল্ডিং
অন্যান্য অফিস থেকে একটু উত্তরে লাল দীঘির অপরপারের একটি স্থান। এখানে আগে St Anne's church থাকলেও এখন স্থানটি একদম ফাঁকা। মাত্র এক বছরের মধ্যেই শেষ হলো ভবন নির্মাণের নকশার কাজ, ১৭৭৭ সালেই শুরু হলো নির্মাণকাজ। তখন নিম্নপদস্থ কর্মচারী বা junior clerk-দের বলা হতো writer. সেই থেকেই এই ভবনের নাম হলো Writer’s Building. সময়ের সাথে সাথে যখন ইংরেজরা সারাভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারের সিদ্ধান্ত নিলো, তখন দরকার হলো এক শক্তিশালী প্রশাসনের। শক্তিশালী প্রশাসন তৈরি করতে গেলে দরকার দক্ষ কর্মী, আর তাই উন্নত মানের প্রশিক্ষণ। ১৮০০সালে কর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্দেশে প্রতিষ্ঠা করা হলো Fort William College. ১৯৩০ সাল পর্যন্ত Fort William College-এর অবস্থান এখানেই ছিলো।

১৮৩০ সালের পর থেকেই এই ভবনের বাণিজ্যিকিকরণ শুরু। ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে, সরকারী সম্পদের commercialization তখনও হতো, আর এমন সময় যখন ইংরেজদের সাম্রাজ্য ক্রমাগত বিস্তারিত হচ্ছে এবং ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আয় প্রচন্ডভাবে বেড়ে চলেছে। Writer’s Building-এ তখন গুদামঘর, বেসরকারী আবাসন এমনকি দোকানও চালু হয়েছিলো। ভারতে ইংরেজদের সাম্রাজ্য বিস্তার আর এখানকার সম্পদ বিলেতে নিয়ে যাবার জন্যই প্রয়োজন হলো উন্নত পরিকাঠামো, আর তার জন্য junior clerk বা  writer এর পরিবর্তে দরকার হলো দক্ষ কর্মকর্তার। বিলেত থেকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী আনার ব্যয়ের কথা চিন্তা করেই ইংরেজরা নতুন নীতি গ্রহণ করলো। সেটি হলো ভারতীয়দের প্রাশ্চাত্য কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা। সেই উদ্দেশেই ১৮৫৪ সালের Thomason College of Civil Engineering প্রতিষ্ঠার পর কোলকাতার Writer’s Building-এই ভারতের দ্বিতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপিত হলো ১৮৫৬ সালে। শিবপুরের স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের আগে পর্যন্ত Writer’s Building-এই বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এর পঠন-পাঠন চলতো। এভাবেই এই একটি সাধারণ সরকারি ভবন multipurpose building এ পরিণত হয়েছিলো।

এই ভবনের ভাগ্য পরিবর্তন শুরু হয় ১৮৭১ সালের পর থেকে,  যখন বাংলার Lieutenant Governor-General জর্জ ক্যাম্পবেল সরকারী কাজের জন্য একটি secretariat-এর প্রয়োজন অনুভব করলেন এবং এইজন্য এই ভবনকেই পছন্দ করে বসলেন। ইতিমধ্যে মহাবিদ্রোহের ঢেউ সারাভারতেই বয়ে গেছে। ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া
যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান কার্যালয়
কোম্পানীর বদলে ভারত শাসন করছে ইংরেজ সরকার, আর ক্যাম্পবেল সাহেব স্বয়ং সরকারের প্রতিনিধি। কথায় আছে, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। তাই স্বয়ং ক্যাম্পবেল সাহেবের ইচ্ছাতেই Writer’s Building থেকে একে একে সবকিছু সরতে শুরু করলো, আর একের পর এক ব্লক যুক্ত হতে লাগলো। একটা সময় Writer’s Building পরিণত হলো সমগ্র ভারতের প্রশাসনিক সদর হিসেবে। একে কেন্দ্র করেই লাল দীঘি চত্বরে গড়ে উঠতে লাগলো একের পর এক সরকারী অফিস, গড়ে উঠলো অফিস পাড়া। লর্ড ডালহৌসির নামে লাল দীঘি চত্বরের নাম হলো ডালহৌসি স্কোয়ার।

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ ও দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তর হলেও Writer’s Building এর গুরুত্বে এতটুকু ভাটা পড়েনি। সারা ভারতজুড়ে তখন বিপ্লবী কর্মকান্ড বেড়েই চলেছে, আর প্রেসিডেন্সি পুলিশের সদরদপ্তর এই ভবনে হওয়ায় এর গুরুত্ব ক্রমাগত বেড়েই চলেছিল। এই ভবন দখলের পরিকল্পনা বিপ্লবীদের থাকলেও কঠোর নিরাপত্তার কথা ভেবে তা আর হয়ে উঠছিলো না। অবশেষে ১৯৩০ সালে সম্পূর্ণ ইংরেজদের পোশাকে, অন্য পরিচয়ে আর লুকিয়ে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে বাংলার তিন বিপ্লবীঃ বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত আর দীনেশ গুপ্ত। Writer’s Building এর ভেতরে ঢুকে তারা প্রথমে হত্যা করে কারা বিভাগের মহাপরিদর্শক (IG Prison)জেনারেল সিম্পসনকে। তারপরেই শুরু হয়ে যায় Writer’s Building এর অলিন্দে এক যুদ্ধ, তার নাম অলিন্দ যুদ্ধ। স্বাধীনতার পড়ে এই তিন বিপ্লবীর নামেই ডালহৌসি স্কোয়ারের নাম হয় বি.বা.দী. বাগ।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে এই ভবন প্রথমে চলে যায় ভারত সরকারের মালিকানায়, পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে। এই ভবনই হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান কার্যালয়। পরবর্তীতে স্থানাভাবের কারণে কিছু সরকারী দপ্তর অন্যত্র চলে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকগুলি, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, কারা বিভাগ এদের দপ্তর এখান থেকেই পরিচালিত হতো, এমনকি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও এখান থেকেই রাজ্য পরিচালনা করতেন।

স্বাধীন ভারতের রাইটার্স বিল্ডিংও পুর্বের থেকে কম লোমহর্ষক নয়। তবে এবারের আক্রমণকারী বিপ্লবী নয়, কোনো এক অশরীরী। আজ্ঞে হ্যা, ঠিকই পড়ছেন আপনি। হঠা্ৎই কোলকাতার Haunted Place গুলির নামের তালিকায় জায়গা করে নেয় এই  Writer’s Building. নানারকম ভূতুড়ে গল্পও ছড়িয়ে পড়ে। জরুরী অবস্থার সময়ে যখন সংবাদপত্রের ওপর সেন্সর চলছে, এই মহাকরণে বসেই তখনকার তথ্যমন্ত্রী ভোররাত পর্যন্ত সংবাদপত্রগুলির পরীক্ষা করতেন। একদিন হঠাৎ তিনি নাকি ভূতের অস্তিত্ব টের পেলেন। যাই হোক ভূতের গল্প ছড়াতে খুব বেশী সময় লাগেনি। 

এই ভবনের গুরুত্ব সবকিছুকে ছাপিয়ে গেলেও সময়ের কাছে তাকে হার মানতেই হলো।
বর্তমান অবস্থা
২০১৩ সালে সংস্কারের জন্য এই ভবন থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সদর দপ্তর সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় Hooghly River Bridge Commission এর তৈরি একটি বহুতলে আর রাজ্য পুলিশের সদর আলিপুরের ভবানী ভবনে। একে একে সবগুলো দপ্তর সরে গেলে শুরু হয় এই ভবনের সংযোজিত অংশ ভাঙ্গার কাজ। কবে এই ভবনের সংস্কার শেষ হবে তাও অজানা। শুধু এইটুকুই জানা যাচ্ছে যে, সংস্কারের কাজ চলাকালীন সাপ, ভাম, ইঁদুর প্রভৃতির দেখা মিলছে। ২৩৬ বছর রাজত্ব করা ভবনরাজ আজ নিজেই কয়েক বছর ধরে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে।













Theme images by saw. Powered by Blogger.