দুই ফোঁটা জল
দুই ফোঁটা জল
শীর্ষক দত্ত
১
পিহু, এই পিহু…… ক্যান্টিনে
চল………চেচিয়ে একটি মেয়েকে ডাকল ছেলেটি।
হঠাৎ চমকে উঠলো অয়ন। বিকেলের ক্লাসটা
cancel হওয়ার পরেই বের হয়ে আসছিল university থেকে, শালার ছেলের জন্মদিন আজ। সেখানে যেতেই হবে সন্ধ্যেতে। বিকেলের ক্লাসটা cancel হওয়ার খবর পেতেই খুশি হয়ে উঠেছিলো । পড়ানো অয়নের passion হলেও আজকাল আর ভালো লাগে না। কিন্তু ক্যাম্পাস এর ভেতর পিহু ডাকটা শুনেই
এলোমেলো হয়ে গেল অয়নের মন। এই পিহু অয়নের কেউ না, কিন্তু অয়নের খুব কাছের কেউই
হওয়ার কথা ছিল। বাইশ বছর পরে একটি কথার বিস্ফোরণ যেন হঠাৎই ধাক্কা দিল
অয়নের মনকে। “যদি ছেলে হয় তবে নাম রাখব
পিকু আর ......মেয়ে হলে পিহু...” -প্রতিমার পছন্দকেই নিজের পছন্দ মনে করে হেসে
উঠেছিলো একুশ বছরের অয়ন। তাদের তিন বছরের ভালবাসার সম্পর্কে দুজনের মধ্যে মিলটাই
বেশি ছিল, বেশ একটা পরিপূরক ব্যাপার।
প্রতিমা অয়নের এই
দীর্ঘ জীবনের প্রথম প্রেম, হয়তো একমাত্র প্রেমও।
২
উচ্চমাধ্যমিকে খুব একটা ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি অয়ন, প্রতিমাও না। যদিও
প্রতিমার রেজাল্ট অয়নের থেকে অনেকটাই ভালো। অয়ন উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়, তার অনুরাগ
সাহিত্যের প্রতিই। বাংলা নিয়ে একটা সাধারন কলেজে পরতে পারলেই তার মানসিক
তৃপ্তি। অপরদিকে প্রতিমার স্বপ্ন অনেক বড়,
সবকিছুতেই ও অনেক serious.
“আমাদের সংসারে তুমিই কর্ত্রী হবে, আমি তো househusband এর মতো” মজা করে বলেছিল অয়ন।
“তাই ই হবে দেখে
নিও”,অয়নের কাঁধে একটা টোকা দিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল প্রতিমা।
অয়ন আর প্রতিমার
সম্পর্কটা ছিল তাদের স্বপ্নের মতই সুন্দর। তাদের যৌবন কেটেছিল কোলকাতার রাস্তায়
রাস্তায় ঘুরে। অয়ন ক্লাস করতো কদাচিৎই। নিজের কলেজের চেয়ে প্রতিমার কলেজেই তার সময়
কাটতো বেশি । প্রতিমার কলেজের বন্ধুদের সাথেই তার বেশি ভালো বন্ধুত্ব।
প্রতিমার বন্ধুরাও অয়নকে ভালো ছেলে মনে করতো । আসলে যে কোনো সহজ সরল ছেলেকেই মেয়েরা ভালো ছেলে বলে মনে করে। যখন
1st year এ অয়নের অনার্স কেটে
গেল, প্রতিমাই একমাত্র অয়নকে উৎসাহ দিয়ে গিয়েছিলো। বাংলায় অনার্স টেকাতে না পারাটা
সবার কাছে একটা মজার ব্যাপার। অনেকে যে আড়ালে বিদ্রূপও করতো তাও অয়নের জানা ছিল। কিন্তু অয়নের মনে খুব একটা দুঃখ হয়নি। প্রতিমা পাশে থাকায়
ব্যর্থতাগুলো তেমন দাগ কাটতে পারেনি অয়নের মনে। প্রতিমাকে খুবই ভালোবাসতো অয়ন,
হয়তো নিজের থেকেও বেশি। English অনার্স এর স্মার্ট মেয়ে প্রতিমাও পছন্দ করতো অয়নের সরলতা। আর তাই হয়তো
একসাথে সারাটা জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিলো তাদের।
৩
অয়নকে আগে বাড়ি
ফিরতে দেখে খুশিই হলো তার স্ত্রী। ভাইয়ের ছেলের জন্মদিন নিয়ে তার যা উৎসাহ, হয়তো
নিজের ছেলের জন্মদিন হলেও এতোটা হতো না। Fresh হয়ে নিয়ে আলমারি থেকে নতুন জামাকাপড়
বের করলো অয়ন। শালার বাড়ি বাগবাজার, এখান থেকে এক ঘন্টা তো লাগবেই। এতটা পথ গাড়ি
চালিয়ে যেতে হবে ভেবেই মনটা কেমন করে উঠলো। একটা সময় গাড়ি চালাতে ভালো লাগলেও এখন
আর অতটা উৎসাহ পায় না সে। তাছাড়া কয়েকশো টাকা দিলেই daily basis-এ ড্রাইভার পাওয়া যায় এখন। কিন্তু ড্রাইভার এর জন্যে center এ ফোনটা করতেও ইচ্ছে হলো না তার।
বিকেলে পিহু নামটা শোনার পর থেকেই মেজাজটা বিগড়ে গেছে। বাইশ বছরের ভুলে থাকা
স্মৃতি যেন কেউ খুঁচিয়ে বের করে এনেছে। যেন এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হঠাৎ জেগে উঠেছে ।
শালার জন্মদিনে যাওয়ার ইচ্ছেটাই পুরো নষ্ট হয়ে গেল অয়নের। কিন্তু মন না চাইলেও
যেতে হবে অয়নকে। ভাইয়ের প্রতি অসম্ভব টান তার স্ত্রীর, ভাইয়েরও যথেষ্ট আছে। তাই না চাইলেও যেতে তো তাকে হবেই।
নতুন জামাকাপড় পরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো অয়ন।
৪
সাড়ে তিন বছরের পরে
তাদের সম্পর্কে ফাটলটা ধরা পড়ল। প্রতিমার কথায় হঠাৎই একটা অবজ্ঞার সুর অনুভব করলো
অয়ন। প্রতিমার English অনার্স
শেষের দিকে, কোলকাতার একটা ভালো কলেজে MBA
তে ভর্তিও তার হয়ে গেছে। কিন্তু অয়ন এখনও 2nd
year এর গন্ডিও পেরোতে পারেনি। অয়ন একটা ভালো চাকরি না পেলে
প্রতিমার বাবার সামনে কিভাবে গিয়ে দাঁড়াবে তাই নিয়ে প্রতিমার অত্যন্ত ক্ষোভ।
প্রতিমাকে বুঝিয়ে শান্ত করতেই পারছিলো না অয়ন। প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া হচ্ছিলো তাদের
মধ্যে। অয়নের কথাগুলো সে বুঝেও যেন বুঝতে চাইছিলো না। এরপর শুরু হলো নতুন ইস্যু।
অয়নের সরলতা নাকি একেবারেই দৃষ্টিকটু।
একটু স্মার্ট না হলে অয়নের সাথে রাস্তায় চলা যায় না। আস্তে আস্তে অয়নের মন
ভেঙ্গে যাচ্ছিল, প্রচন্ড অভিমান জমছিলো। অয়নের যেগুলো প্রতিমার ভালো লাগতো একটা সময়ে,
এখন সেগুলই অপছন্দের হয়ে উঠছিলো প্রতিমার কাছে।
তাদের সম্পর্কের
চার বছর হতে আর মাত্র চারদিন বাকি, হঠাৎই প্রতিমা সবরকম যোগাযোগ বন্ধ করে দিল।
অনেক চেষ্টা করেও তার সাথে কোনও যোগাযোগ করতে পারলো না অয়ন। 4th anniversary তে অয়ন ভাবছিলো
এটা সম্পর্কের চার বছর নাকি সম্পর্কটা ভাঙার চারদিন।
কয়েক মাস পরে যখন
প্রতিমার সাথে রাস্তায় একবার দেখা হয়েছিলো, অয়ন শুধু বলেছিলো, “ভালো থেকো, সুখে
থেকো ।” সেই দিনই অয়নের চোখ থেকে শেষবারের মতো গড়িয়ে পড়েছিলো কয়েক ফোঁটা জল।
৫
জন্মদিনের পার্টিটা
বেশ জমেছে। তাদের চেনা সব আত্মীয়-স্বজনদের সাথে একটা পুনর্মিলন হলো।
আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অয়নের গুরুত্ব অনেকটাই বেশী। সেইই সবচেয়ে বেশী শিক্ষিত,
কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক। আয়ও হয়তো সবার থেকে বেশি। সরকারের ভাষা
আর সাহিত্যের অনেক কমিটিরই মেম্বার সে। তার লেখা কিছু বই বেশ কিছু কলেজের পাঠ্য।
ভাষাতত্ত্বের ওপর তার গবেষণার খ্যাতিও যথেষ্ট। স্বামীকে নিয়ে অয়নের স্ত্রীর গর্ব
অনেক - অবশ্য গর্ব না অহঙ্কার তা অয়ন একেবারেই বুঝতে পারে না। তার আত্মীয়-স্বজনদের
নিজেদের মধ্যে position আর status
নিয়ে একটা অদ্ভূত প্রতিযোগিতা সে লক্ষ্য করেছে। অবশ্য প্রতীযোগীরা
সকলেই অয়নের থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও সে এই প্রতিযোগীতায় নেই।
অয়ন তার স্ত্রীর
প্রতি দায়িত্বপালনে ত্রুটি করেনি কোনওদিন। এটাকেই তার স্ত্রী ভালোবাসা মনে করে
সুখে আছে। অত্যধিক স্বচ্ছলতা আর দায়িত্ববান স্বামী- যে কোনও মেয়েকেই সুখে রাখবে।
তার ধারণা তার স্বামীও সুখেই আছে। হয়তো সবারই ধারণা অয়ন খুব সুখে আছে।
একমাত্র অয়নই জানে
সে সুখে নেই, ছিলও না। তার জীবণের একমাত্র ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পায়নি। অন্য কাউকে
বিয়ে করেছে অয়ন। প্রতিমারও বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগে। সব ভুলেই গিয়েছিল সে। প্রতিমার
কথাও মনে পড়ে নি কত বছর হয়ে গেল। আজ হঠাৎই একটা নামের জন্যে সবকিছু নতুন করে মনে
পড়ে গেল। বাইশ বছর বাদে আবারও দুফোঁটা জল বেরিয়ে এলো অয়নের চোখ থেকে - প্রতিমার
জন্যে।


satyi osadharon
ReplyDelete