নিলা ও তার ইতিকথা
নিলা ও তার ইতিকথা
মোঃ মেহেদী আলম
১
গল্পটা আর দশটা গল্পের মতো হলেও শেষটা অন্যরকম। অন্য গল্পের মতো এই গল্পেও নায়ক নায়িকা বিদ্যমান। প্রথমে নায়িকা এর বর্ননা দেয়া যাক। আমার গল্পে নায়িকার নাম নিলা। লম্বা ৫ ফুট ২ ইঞ্চি, দেখতে ফর্সা আর গোলাকার চেহেরার অধিকারী। এক কথায় অসাধারন। নিলা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। নিলা গ্রামে মানুষ হলেও শহুরে জীবন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান কেননা তার নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত ছিল। নিলা ঢাকায় বেড়াতে আসার সূত্রে তাকে তার এক দূর-সম্পর্কের ভাই আশিক এর ভালো লেগে যায়। কিন্তু নিলাকে আশিক ভালো লাগার কথা বললে নিলা নীরব ভূমিকা পালন করে। নিলারা ৫ বোন ২ ভাই। নিলা পরিবার এর সবার ছোট। নিলার বড় বোন অনেকটা দেখতে নিলার মতই হওয়ায় আর নিলার নীরব ভূমিকা পালন করায় আশিক নিলার বড় বোনকে ভালো লাগার কথা বলে এতে নিলা ঈর্ষানীত হয়ে আশিকের ডাকে সাড়া দেয়। এখানে বলা ভালো যে, ততোদিনে নিলা উচচ-মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য ঢাকাতেই কোচিং ক্লাস করে। এতে করে নিলা আর আশিকের প্রেম ধীরে ধীরে জমে উঠে। প্রতিদিন তাদের ফোনে কথা হতে থাকে আর মাঝে মাঝে ক্লাশের শেষে দেখা। রেস্টুরেন্টে কিছু সময় পার করা। সবকিছুই ভালো চলছিল। কিন্তু হঠাৎ তাদের সম্পর্কের খারাপ হতে থাকে কারন তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যায় এতে তাদের সম্পর্কটা ভেঙ্গে যায়
২
নিলা ঢাকার কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চান্স না পাওয়ায় আর আশিককে হারানোর বেদনায় গ্রামে ফিরে আসে কেননা নিলার স্বপ্ন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার। সে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং সব ভূলে নতুন করে শুরু করতে চায়। সামনে এগিয়ে যাওয়া নিলার মূল লক্ষ্য থাকলেও আবার নীলার বান্ধবী চাদঁনীর বন্ধু আকাশের সাথে পরিচিত হয়। পরিচয় থেকে ভালো লাগা। আর ভালো লাগা থেকে দুর্বলতা। দুর্বলতা থেকে প্রেম।নিলা পিছনের গল্প ভূলে সামনে আবার নতুন করে বাচাঁর সপ্ন দেখে। নিলা ফোনে কথা বলা, দেখা করা আর ক্লাস করে ভালই দিন কেটে যাচিছল। আশিকের সাথে প্রেম গোপন থাকলেও আকাশের সাথে প্রেম আর গোপন থাকলো না নিলার। নিলার বাড়িতে মোটামুটি সবাই জেনে গেলো আকাশ আর নিলার কথাটা। দেখতে দেখতে ২ বৎসর পার হয়ে গেল আকাশ আর নিলার সম্পর্কের। ততোদিনে নিলার পড়ালেখাও শেষ। এই সময় নিলার বাসা থেকে নিলাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে নিলা আকাশকে বিয়ে করবে বলে তার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে। অন্যদিকে আকাশ উচচ শিক্ষার জন্যে কানাডা পাড়ি জমায়। কিন্তু আকাশ যাওয়ার সময় কথা দিয়ে যায় ঠিক ১ বৎসর পর দেশে এসে নিলাকে বিয়ে করবে। নিলা পরিবারের সকল চাপ সহ্য করে আকাশের পানে চেয়ে বসে থাকে। আস্তে আস্তে নিলার আকাশে কেমন জানি কালো মেঘে ছেয়ে গেলো। আকাশ কানাডা যাওয়ার পর কেমন করে বদলে গেলো। এখন আকাশ ফোনেও কথা বলার সময় পায় না। নিলা বডড একা আজ। সে আজও বৃষ্টির দিনে আকাশের সাথে রিক্সায় ঘুরে বেড়ানো কথা মনে করে শিউরে উঠে। এখন নিলার মাঝে মধ্যে আকাশের সাথে কথা হয়। আকাশ আজও কথা দেয় সে ফিরে আসবে কিছুদিন পরে আর নিলাকেই বিয়ে করবে। আর নিলার পরিবারের সাথে নিলার দূরত্ব বড় হচ্ছে আকাশকে বিয়ে করা নিয়ে । ৩ বৎসর হলেও আকাশ দেশে ফেরে না। নিলা না পারচ্ছে আকাশ কে ভুলতে না পারচ্ছে অন্য কাউকে বিয়ে করতে। অবশেষে আকাশ নিলাকে জানিয়ে দেয় তার পক্ষে নিলাকে বিয়ে করা সম্ভব না। ৫ বৎসরের সম্পর্ক ভেঙ্গে যেন নিলার আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। নিলা কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা ।
৩
আকাশের কথা মনে হলেই নিলা আকাশকে কল দিত কিন্তু আকাশ তাকে এখন আর পাত্তা দেয় না। নিলা ভীষন একা হয়ে পড়ে। হঠাৎ নিলার আবার আশিকের কথা মনে পড়ে। মাঝে মধ্যেই নিলা আশিককে কল দেয় কিন্তু আশিকেরও এখন নিলার জন্য কোনো সময় নেই কেননা আশিক এখন অন্য কারও প্রেমে দিওয়ানা। যখন আশিকের সাথে নিলার সম্পর্ক তখন আশিকের বন্ধু কামালেরও নিলাকে ভালো লাগতো। আর এই কথা আশিক ভালো করেই জানত। একদিন নিলা আশিককে কল করলে আশিক কামালের ভালো লাগা নিলাকে বলে দেয়। কিন্তু নিলা রাজী হয়না। এমনি করে নিলার অনেক দিন কেটে যায়। এখন নিলা তার ভুল গুলোকে পুজিঁ করে কবিতা লিখে অনেকটা এমন-
তার ভুল গুলোকে পুজিঁ করে কবিতা লিখে অনেকটা এমন-
ভূল
হারিয়ে খুঁজি তোমায় ,
নির্লোভ জোছনায়
কখন যে পাবো তোমায় ,
আমার এই সীমানায়।
গিয়েছিলে দূরে,
হারিয়ে ছিলাম ভূলে
ভূলেই হলো শেষ,
আমি হলাম নি:শেষ।
ভূলের মাঝে বাঁচি আমি,
ভূলেই করি বসবাস,
ভূল মানুষের সঙগ খুঁজি,
ভূলই করি বারোমাস।
ভূলের মাঝেই আছে সুখ,
সুখের মাঝেই ভূল,
তাইতো তোমায় ভেবে হলাম আমি ব্যাকুল।
হয়তো ভূল করেই পাবো ফুল,
ফুলের মাঝেই ভূল
ভূলেই আমার বাঁচা-মরা,
ভূলেই আমার কূল।
হারিয়ে খুঁজি ভূলে তোমায় আমার এ চেতনায়,
আবার তোমায় পাবো ফিরে আমার এ মোহনায়।
অবশেষে নিলা বড্ড একা হয়ে পরে। সে এখনও ভাবে আকাশ তার দেওয়া কথা রাখবে । না আশিক তার কল রিসিভ করে না আকাশ রিসিভ করে। শেষে নিলা আশিকের কাছে থেকে কামালের সাথে যোগাযোগ করে। এ তে কামাল নিজেকে ধন্য মনে করে। আস্তে আস্তে কামাল আর নিলার চ্যাট হয়। একে অপরের অনেক কিছুই জানতে পারে। একদিন নিলা গ্রাম থেকে ঢাকা আসে কামালের সাথে দেখা করতে । কামাল আর নিলার একটা রেষ্টুরেন্টে দেখা হয়। দুই জন দুই জনকেই ভালো লাগে। এমনি করে তাদের চ্যাট চলতে থাকে। আর মাঝে মধ্যে ফোনে কথা। কিন্তু নিলার সবসময়ই কামালের সাথে আকাশের কথাই বলতো। কামাল আর নিলার বন্ধুত্ব প্রথম ৭ দিন ভালই চলে। হঠাৎ নিলা একদিন কামালকে ৬ মাসের মধ্যে বিয়ে করতে বলে।কিন্তু কামাল নিলাকে প্রথমেই সম্ভব না বলে জানায় দেয়। কামাল মিনিমাম সময় চায় ২ বৎসর এতে নিলাও বলে তারপক্ষে সম্ভব না। এমনি করে দেখা যায় কামাল আর নিলা দুই জন দুই মেরুর। এখন কামালও নিলা থেকে দূরে সরে যেতে চায় কিন্তু চিমনীর মিটমিট আলোর মতো করে কামাল আর নিলার সম্পর্ক টিকে রইল। কামাল বারবার বলার পরও নিলা ফ্রেন্ডলিষ্ট থেকে কামালকে বাদ দিল না। কিছুদিন এমনে চলতে থাকলো। অবশেষে কামাল ব্লক খাওয়ার উপায় খুজেঁ পেলো । চ্যাটে খারাপ কথা যেমন হট ফটো দিতে বললেই নিলা কামালকে ব্লক দিত। কিন্তু এ ব্লক সীমিত সময়ের জন্যে। ২ দিন পর আবার কামাল আর নিলার চ্যাট হতো। কিন্তু নিলা কামালকে কল দিলে কামাল কল রিসিভ করতো না। এমনি হট ফটো হট ফটো করে কামাল ইচ্ছা করে নিলার কাছে ব্লক খেতো। যেন যোগাযোগ না হয়। নিলা আর কামালের সম্পর্কে ধীরে ধীরে ফাটল দেখা দিল।
৪
কামাল আর নিলার সম্পর্কের ১৫ দিনের মধ্যেই শেষ। এখানে বলা ভালো যে, কামালের নিলার সাথে কেবল ইমুতেই চ্যাট আর মাঝে মধ্যে কথা হতো। কেননা কামাল একটু লাজুক স্বভাবের ছিল তাই ফোনে কথা বলতে চাইতো না। কিন্তু চ্যাট দেখে কামালকে লাজুক বলা যাবে না। তো কামাল ব্লক খাওয়ার পর তিনদিন পর কামালের সাথে নিলার যোগাযোগ হয় রাত ৮ টার দিকে বিষয়বস্তু উচ্চ শিক্ষার জন্য তথ্য নেয়া কেননা কামালের দেশের বাহিরে শিক্ষা নেওয়ায় অভিজ্ঞতা আছে। নরমাল তথ্য নেওয়ার পর নিলা কামালকে বলে সে দেশের বাহিরে চলে যেতে চায় সবকিছু ছেড়ে তারপর নিলা কামালকে আবারও ব্লক দেয় । অবশেষে নিলা ঐদিন মধ্যরাতে কামালকে কল দেয় কিন্তু কামাল কল রিসিভ করে না। তারপর নিলা ব্লক তুলে কামালকে তার একাকিত্বের কথা বলতে চায়। কিন্তু কামালের গভীর ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় কামাল বিরক্ত হয়ে আবারও হট ফটো চায় কেননা কামাল এত রাতে নিলার সাথে চ্যাট করতে চায় না আর নিলাকে হট ফটোর কথা বললেই নিলা একাই চলে যায়। কিন্তু নিলা চ্যাট-এ ঐদিন কামালকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে ফেলে হট ফটো দিয়ে কি সেক্স করবেন আমার সাথে? কামালের উত্তর হ্যাঁ তাই করবো। এতে নিলা রেগে কামালকে গালি দিয়ে ইমুতে ব্লক দিয়ে চলে যায়। কিন্তু প্রথমবারের মতো ঐদিন রাতে কামাল গালি শুনে নিলার মোবাইলে মেসেজ প্রেরন করে যে এতোরাতে ফাজলামি করতে আসেন। কেননা কামাল হট ফটো চাইত যেন নিলা কামালকে খারাপ ভেবে দূরে চলে যায়। এমনি তাদের ১৫ দিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
৫
প্রতিদিনের মতো কামাল আড্ডা দিতে যায় বলা ভালো যে কামাল আর আশিক ভালো বন্ধু। সন্ধ্যায় কামাল আর আশিক এর আড্ডায় হটাৎ আশিকের আরেক বন্ধু একটা ভিডিও দেখায় একটা অপরিচিত মেয়ে গলায় ফাসিঁ দেওয়ার ভিডিও। তো ঐদিন আড্ডা শেষ হওয়ার পর যে যার বাসায় চলে যায়। বাসায় যাওয়ার পরে কামালের ফোনে আশিকের ফোন এলো। আশিক আর কামালকে নিলার সাথে যোগাযোগ করতে মানা করে । আশিক কারন জানতে চাইলে বলে নিলা সুইসাইড করছে বলে জানায় । কামাল ভীতু টাইপের ছেলে ছিল বলে আশিক হয়তো কামালকে ভয় দেখাচ্ছে কেননা একটু আগেই তারা সুইসাইড ভিডিও দেখছিল তাই কামাল বিশ্বাস করে না। আশিক বারে বারে কামালকে সাবধান করতে থাকে। আশিকরা নিলার দূর সম্পর্কের আত্নীয় হওয়ায় আশিক তার পরিবারের মাধ্যমে জানতে পারে নিলা আর নেই। এতোক্ষনে কামাল ভয় আর নিজেকে নিজে বিশ্বাস করতে পারেনা যে নিলা আর পৃথিবীতে নেই।
৬
অবশেষে সকালে কামালের ফোনে একটা ফোন আসে। ফোনটা পুলিশের কাছে থেকে। কেননা সুইসাইড কেসে পুলিশ কারন অনুসন্ধান করে। কামাল বুঝতে পারে যে সে ফেসেঁ গেসে। অবশেষে পুলিশ কামালকে গ্রেপ্তার করে আর কামালের জায়গা হয় জেলে। কেননা নিলার মোবাইলের মাধম্যে পুলিশ অনুমান করে কামালের হট ফটো চাওয়ার কারনেই নিলা সুইসাইড করে। কামাল উকিলের মাধম্যে কোর্টে প্রমান করতে চায় কামাল নিলার মৃত্যুর জন্য দায়ী না। অবশেষে পুলিশ পরিবারের তথ্যে জানতে পারে নিলা মৃত্যুর পূর্বে আকাশের সাথে ভিডিও চ্যাট এ ঝগড়া করে এবং এক পর্যায় দরজা বন্ধ করে আকাশকে ভিডিও কলে রেখে ফাসিঁতে ঝুলে পরে। আর নিলার ফাসিঁর খবর প্রথম নিলার বড় বোনকে আকাশই দেয়। নিলার পরিবার আর এটা নিয়ে এগোতে চায় না কেননা নিলা পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে গিয়েছিল এই আকাশের জন্যে। অবশেষে পুলিশ নিজে বাদী হয়ে আকাশের বিরুদ্বে মামলা করে এতে কোর্ট আকাশকে দায়ী করে প্রতারনার অভিযোগে অন্যদিকে কামাল নিলাকে উত্তক্ত করার জন্য দোষী হয় এবং ১ বৎসরের সাজা হয়। আর আশিক বিদেশে অবস্তান করায় সাজা হওয়া সত্বেও বেচেঁ যায়।
কামাল আজও চিন্তা করে নিলাকে। সবাই সবার মতো করে ভালো আছে। আকাশ আর দেশে ফেরার কথা চিন্তা করে না। কামাল সমাজের চোখে জেল খাটা আসামী। কামাল এখন বুঝতে পারে কাউকে এডিয়ে চলতে চাইলে সরাসরি বলা উচিৎ কোনা খারাপ কথা বলা উচিৎ না। সে বুঝতে পারে অনেক ভূল করে ফেলেছিল যার বিচার সে পেয়েছে।
আসলে নিলারা সমাজে মরে না তারা সারাজীঁবন বেঁচে থাকে। তারা ভালবাসার জন্যে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকে।

No comments