ন্যায়বিচারক
কথায় আছে, সিংহ যতদিন না লিখতে শিখবে সব গল্পই শিকারীর বীরত্ব প্রকাশ করবে। কিন্তু তিনি ইংল্যান্ড,ফ্রান্স,আমেরিকার বিচারকদের সাথে লড়াই করে ন্যায়বিচার এনে দিয়েছিলেন জাপানকে, তাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন মিত্রশক্তি অসম্ভব শক্তিশালী আর জাপান ধ্বংসপ্রায় এবং তিনি ইংল্যান্ডের এক উপনিবেশের অধিবাসী। আর সেই ঘটনা নিয়েই......
ন্যায়বিচারক
শীর্ষক দত্ত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এশিয়ায় জাপানের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য এক সামরিক বিচারের আয়োজন করা হয়। উদ্দেশ্য জাপানের সমরনীতির উত্থানের সাথে জড়িত সামরিক অফিসারদের শাস্তি প্রদান ও জাপানের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার। যুদ্ধে পরাজিত জাপানের এই বিচার নামের প্রহসন মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায়ও ছিলো না। এগারো সদস্যের তৈরি এই "টোকিও ট্রাইব্যুনাল"-এ একজনই বাঙালি বিচারক যার একার যুক্তি আর বুদ্ধিতেই ঘুরে গিয়েছিলো বিচারের অভিমুখ, পরিবর্তিত হয়ে গেছিলো রায়। এখনও জাপানের রাজধানী টোকিওতে তার নামে রাস্তা, মিউজিয়াম, স্ট্যাচু রয়ে গেছে। তিনি রাধাবিনোদ পাল।
রাধাবিনোদ পালের জন্ম ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত কুষ্টিয়া জেলায়। তার বাবার নাম বিপিন বিহারী পাল। কুষ্টিয়া হাইস্কুলে তিনি মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন কলকাতার
প্রেসিডেন্সি কলেজে, পড়া শুরু করেন গণিতশাস্ত্র নিয়ে। ১৯০৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ
থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯১৯-২০
সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে তিনি কর্ম জীবন শুরু করেন। বিএল ডিগ্রী
পাওয়ার পর ময়মনসিংহ কোর্টে ওকালতির চর্চাও চলছিল সমান তালে। ১৯২০ সালে
আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও ১৯২৪ সালে আইনে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করলেন তিনি। যারা বলছিল, আইন চর্চার
সুযোগ পেয়ে শিক্ষকতার মহান ব্রতকে ছেড়ে গেলেন রাধাবিনোদ, তাদের মুখে ছাই
দিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ল কলেজে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত আইনের অধ্যাপনা করেছিলেন
তিনি। তার মাঝেই ১৯৪১ সালে তিনি ভারত সরকারের আইন উপদেষ্টা, তারপর ১৯৪১-৪৩ সাল
পর্যন্ত তিনি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪৬-৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জাপানের রাজধানী টোকিও মহানগরে জাপানকে নানচিং গণহত্যা সহ দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধে
চীনাদের উপর জাপানি সেনাবাহিনীর দীর্ঘ কয়েক দশকের নৃশংসতার অভিযোগে
যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে "টোকিও ট্রাইব্যুনাল" নামের যে বিশেষ আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হয়, তিনি
ছিলেন সেই আদালতের অন্যতম বিচারপতি। বাকি ১০ জন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড,
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও ফিলিপাইনের ছিলেন। এই বিচারে সাতজন শীর্ষস্থানীয় নেতার মৃত্যুদণ্ড, ১৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুই জনকে যথাক্রমে ২০ ও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। নানচিং হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী হিসাবে যুবরাজ আসাকাকে দায়ী করা হয়। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণের শর্ত অনুসারে জাপানের সম্রাট অথবা রাজপরিবারের
সদস্যদের পরবর্তীতে কোন অপরাধের জন্য বিচারের সম্মুখীন করা যাবে না। এই কারনে আসাকাকে কোন বিচারের সম্মুখীন করা যায় নি। বিচারের সময় চলে এলে রাধাবিনোদ ভিন্ন মত পোষণ করলেন। জাপান যুদ্ধের আগে ও
যুদ্ধচলাকালে যে কম অপরাধ ঘটায়নি তা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু
দোষ শুধু জাপানের একার ছিল না। নাগাসাকি, হিরোশিমাতে বোমাবাজি করে মানবতার
অপমান না করলেও জাপান আত্মসমর্পণ করতো। এইসব যুদ্ধাপরাধের জন্য, হাজার
হাজার নিরীহ মানুষ হত্যার জন্য এই শক্তিশালী দেশগুলোরও তাহলে শাস্তি পাওনা
আছে। তার রায় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ফরাসী আর ডাচ বিচারকেরা তা থেকে প্রভাবিত হয়ে কিছুটা নিরপেক্ষ অবস্থানে সরে আসেন। বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল বিজয়ী পক্ষের একতরফাভাবে প্রণীত বিচারের দিক নির্দেশনা ও বিধিনিয়ম দ্বারা চালিত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানের পক্ষে রাধাবিনোদ পালের এই ন্যায়বিচার দেওয়ার প্রচেষ্টা তাকে জাপানিদের মাঝে খুবই জনপ্রিয় করে তোলে। তার এ রায় বিশ্বনন্দিত ঐতিহাসিক রায়ের মর্যাদা লাভ করে ও জাপানকে সহিংসতার দীর্ঘ পরম্পরা ত্যাগ করে সভ্য ও উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশে প্রধানতম সহায়ক ভূমিকা পালন করে। রাধাবিনোদ পালকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করা হয় নিহোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে ১৯৬৬ সাল। জাপান সম্রাট হিরোহিতোর কাছ থেকে জাপানের সর্বোচ্চ সম্মানীয় পদক ‘কোক্কা কুনশোও’ গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৫২ সালে রাধাবিনোদ পাল রাষ্ট্রসংঘ আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের সদস্য নির্বাচিত
হন। তিনি ১৯৫৪ সালে কমিশনের দ্বিতীয় ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৫৮ সালে
চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে পুনরায় তিনি কমিশনের চেয়ারম্যান
নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ তাঁকে হেগের আন্তর্জাতিক
আদালতের বিচারক নির্বাচিত করেন। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’
উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তাঁকে Jurisprudence-এর জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগ
করেন। একই বছর তিনি আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল’য়ের সদস্য
নির্বাচিত হন।
খ্যাতিমান এই মনিষী রাধা বিনোদ পাল ১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জাপানি প্রধানমন্ত্রী "মিস্টার আবে" ভারতে এসে বিশেষ করে কলকাতায় এসেছিলেন রাধা বিনোদ পালের
পুত্রকে সমগ্র জাপানের তরফে কৃতজ্ঞতা জানাতে | ভারত-জাপান অতি সুসম্পর্কের নেপথ্যে তার অবদানকে কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না। রাধাবিনোদ পালের মতো ব্যক্তিত্বের কথা তো অনেকেরই অজানা।
----

er nam age sunini, satyi khub valo lekha, osadharon
ReplyDeletekhubi informative
ReplyDeletenotun golpo
ReplyDelete