দূর্গার জন্ম
মাতৃশক্তির আরাধনা করা ভারতবর্ষে সবচেয়ে বেশি পূজিত হন বোধহয় দেবী দূর্গাই। কিন্তু তার অভিনব আর যুগান্তকারী জন্মবৃত্তান্তের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক হতাশা আর করুনার গল্প। পৌরাণিক দূর্গার থেকেও বাস্তবের দূর্গার কাহিনী অনেক বেশী আশ্চর্যের। আর বাস্তবে অশুভ শক্তির হাতে শুভ শক্তির পরাজয়ের সত্যি ঘটনা নিয়েই......
দূর্গার জন্ম
শীর্ষক দত্ত
ভারতে নবজাগরণের শহর হলো কোলকাতা। আধুনিক শিক্ষা, প্রগতিশীল চিন্তা, সমাজ সংস্কার আর সর্বোপরি অসংখ্য ব্যক্তিতের জন্ম একে পৃথিবীর অন্য এক সেরা মহানগরে পরিণত করেছে। কিন্তু এই শহরেই ১৯৮১ সালের ১৯ জুন আত্মহত্যা করেন এক চিকিৎসক। তখন কোলকাতা পৃথিবীর দশটি বড়ো শহরের মধ্যে একটি। একটি আত্মহত্যা সেখানে আপাতভাবে সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই চিকিৎসক ছিলেন দূর্গার জন্মদাতা এবং দূর্গার জন্ম পরবর্তী পরিস্থিতিই দায়ী তার এই পরিণতির জন্য। অথচ তিনি দুর্গার পিতা নন, শুধুই জন্মদাতা। শুনতে আজ এতটা অবাক বা লাগলেও তখনকার দিনে এটাই ছিলো অসম্ভব।আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে গিয়েই যার এই পরিণতি তিনি হলেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
১৬ জানুয়ারি ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত হাজারিবাগে এক বাঙ্গালি পরিবারে জন্মগ্রহন করেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তিনি ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। তিনি ঐ বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীরবিদ্যা বিষয়ে বিএসসি ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন প্রজনন শারীরবিদ্যা বিষয়ে গবেষণার জন্য। এরপর তিনি ইংল্যান্ড পাড়ি দেন ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে এবং এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জন লোরেনের সঙ্গে গবেষণা শুরু করেন। সেই গবেষণার মাধ্যমেই তিনি লিউটিনাইজিং হরমোনের পরিমাপ নির্ণয়ের এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। যার ফলে ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয়বার পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।
লন্ডন থেকে কোলকাতায় ফিরে তিনি যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তরে, কাজ শুরু করেন কোলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। সেখানে একদিকে যেমন তার হাতে জন্ম নিতে থাকে একের পর এক শিশু, তেমনি নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের স্বল্প পরিকাঠামোর মধ্যে একমাত্র তার প্রচেষ্টাতেই চলতে থাকে মানবজন্মের ভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণা। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা অক্টোবর তিনি ভারতের প্রথম চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী হিসেবে এক টেষ্ট-টিউব শিশুর জন্ম দিয়ে ইতিহাস স্থাপন করেন। তিনি এই শিশুটির নাম রাখেন দুর্গা। আর সুভাষের গবেষণার দ্বারা দুর্গার জন্ম হয় প্রথম টেষ্ট-টিউব শিশু লুইস জন ব্রাউনের জন্ম দেওয়ার মাত্র ৬৭ দিন পর। তাও সুভাষের পদ্ধতি অনেক বেশি আধুনিক ও মৌলিক ছিলো।
ইংরেজ বৈজ্ঞানিক প্যাট্রিক স্টেপটো ও রবার্ট জিওফ্রি এডওয়ার্ডস ওল্ডহ্যাম জেনারেল হসপিটালের অত্যাধুনিক পরিকাঠামোতে করা তাদের গবেষণার ফলশ্রুতিতে ১৯১০ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। কিন্তু সুভাষের পুরষ্কার বলতে জোটে শুধুই অসম্মান আর অবিশ্বাস। সুভাষের গবেষণা আর দূর্গার জন্মবৃত্তান্ত জনসমক্ষে এলে অন্যান্য ডাক্তাররা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্যদপ্তর তার গবেষণার সত্যতা যাচাই করতে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই নভেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিখ্যাত চিকিৎসক সুভাষের সমস্ত গবেষণা মিথ্যা বলে রায় দেয় সেই কমিটি। শাস্তি স্বরূপ তাঁকে তাকে প্রথমে বদলি করা হয় কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাঁকুড়ায়। পরবর্তীতে ‘রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব অপথ্যালমোলজি’-র চক্ষু বিভাগে স্থানান্তরিত করে দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রজনন শারীরবিদ্যা নিয়ে তাঁর সমস্ত গবেষণা বন্ধ হয়ে যায়।এমনকি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে তার গবেষণার সম্বন্ধে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রন আসলে চাইলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিতেও অস্বীকার করে।
সরকারের অসযোগিতা, গবেষণা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর ওপর শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসক সমাজ দ্বারা ক্রমাগত বিদ্রুপ ও অপমান। অভিযোগ, সুভাষবাবু যাতে কোনও ভাবে স্বীকৃতি না পান, সে জন্য এক সময় উঠেপড়ে লেগেছিলেন বহু নামী চিকিৎসক।ফলে তিনি ক্রমশ বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। অবশেষে ১৯৮১ সালের ১৯ জুন দূর্গার জন্মের মাত্র আড়াই বছর পর শেষ করে দেন নিজেকে। যেন অসীম শক্তিশালী বিজ্ঞানের পরাজয় ঘটে রাজনীতি আর স্বাস্থ্য ব্যবসার অশুভ শক্তির কাছে।
![]() |
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার পাতায়
ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় কে নিয়ে লেখা
|
১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই আগস্ট হর্ষবর্ধন রেড্ডি বুরি জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মদাতা হলেন টি. সি. আনন্দ কুমার। হ্যা, তখন এটাই দেশের প্রথম টেষ্ট-টিউব শিশু। হর্ষবর্ধন রেড্ডির জন্মের জন্য আনন্দ কুমারকে কোনোরকম হেনস্থার মুখে পড়তে হয়নি। বরং তার কপালেই জোটে ভারতের প্রথম টেষ্ট-টিউব শিশুর জনকের তকমা। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা শহরে অনুষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন আনন্দ কুমার। এই সময় ভাগ্যক্রমে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা নথিগুলি তার হাতে আসে। এরপরই তিনি সমস্ত নথিগুলি যাচাই করতে শুরু করেন। আলোচনা করেন দূর্গার পিতা-মাতার সাথেও। অবশেষে নিশ্চিত হন যে, তিনি নন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ই ছিলেন ভারতের প্রথম টেষ্ট-টিউব বা নল-জাত শিশুর স্রষ্টা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরকে পাঠানো গবেষণা সংক্রান্ত সুভাষের চিঠির কথা তিনি সংবাদমাদ্যমে প্রকাশ করে দেন।
![]() |
আনন্দবাজার পত্রিকায়
ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় কে নিয়ে লেখা
|



khub baje holo onar sathe
ReplyDelete