রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এমনকি একটা আস্ত বোটানিক্যাল গার্ডেনও যার নাম বহন করছে। কিন্ত এই বিখ্যাত নামের অন্তরালে রয়ে গেছে এক বৈষম্য আর সংগ্রামের ইতিহাস। এখনও অনেকে তার নোবেল না পাওয়াকে একটা ষড়যন্ত্র বলেই মনে করে। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসা আর আগ্রহ এসবকে সারাজীবন ধরে উপেক্ষাই করে গেছে।
এক বিজ্ঞানপ্রেমীর জীবন
শীর্ষক দত্ত
সেই সময় ভারত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ। ইউরোপীয়
সংস্কৃতির প্রভাব, ব্রিটিশ শাসক এবং ভারতীয় দেশপ্রেমিকদের মধ্যে বিরোধ ভারতীয়
সমাজকে পরিবর্তন করতে শুরু করে। ব্রিটিশ এবং ভারতীয় দর্শনের সংমিশ্রণ নবজাগরণের
সূচনা করে। এই সময় তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক
ছিলেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হলেও তাঁর অন্যান্য বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ও
অবদানই তাকে বহুবিদ্যাবিশারদ করে তুলেছিল। তাঁর কাজ প্রমাণ করেছে যে বিজ্ঞান এবং
গবেষণার কোনও নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নেই। হ্যাঁ, তিনি হলেন আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানের জনক,
জগদীশ চন্দ্র বসু।
 |
| আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস |
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বর্তমান বাংলাদেশ) –এর অন্তর্গত
ময়মনসিংহ জেলায় ৩০শে নভেম্বর ১৮৫৮ সালে
এক বাঙালি কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা
ভগবান চন্দ্র বসু
ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং সহকারী
কমিশনার।
তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে ইংরাজী
শেখার আগে তাঁর ছেলে নিজের মাতৃভাষা বাংলা এবং ভারতীয় সংস্কৃতি শিখুক, তাই তিনি
তরুণ জগদীশকে স্থানীয় একটি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। তার পরিবার ধনী না
হলেও বোসের বাবা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে জগদীশ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে। যদিও
জগদীশের প্রাথমিক ইচ্ছা ছিল তিনি একজন সরকারী কর্মচারী হবেন,
কিন্তু তার সরকারী কর্মচারী বাবা এই
পরিকল্পনার সাথে একমত ছিলেন না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর
তিনি আরও পড়াশোনা করার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি প্রথমে কেমব্রিজ
বিশ্ববিদ্যালয় এবং তারপরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন,
১৮৮৪ সালে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন
করেন।
১৮৮৫ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং কলকাতার প্রাচীনতম কলেজ
প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। এখানে কাজ
করার সময়ে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত, তিনি ভারতীয় এবং ব্রিটিশ অধ্যাপকদের মধ্যে বেতন পার্থক্যের মধ্য
দিয়ে কর্মক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্যকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি এই অন্যায় পদ্ধতির
বিরুদ্ধে অবিচল প্রতিবাদ করে গিয়েছিলেন, আর তিন বছর ধরে কম বেতন গ্রহণ করতে
অস্বীকার করেছিলেন এবং অবশেষে চতুর্থ বছরে তাকে যোগদানের পর থেকে তিন বছরের বেতন পুরোপুরি
দেওয়া হয়েছিল।
 |
আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস তার নিজের গবেষণাগারে
|
১৮৯৪ সালের নভেম্বরে (মতান্তরে ১৮৯৫) কলকাতার টাউন হলের একটি জনসমাবেশে জগদীশ একটি প্রদর্শনী করেন, যেখা্নে তিনি একটি পিস্তল থেকে একটি ব্ল্যাঙ্কফায়ার করেন এবং মিলিমিটার রেঞ্জের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে কিছুদূর থেকে একটি ঘন্টা বাজিয়ে দেখান। কলকাতা টাউন হলে বোস-এর প্রদর্শনীর সাক্ষী ছিলেন স্বয়ং লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়াম ম্যাকেনজি। এরপর তিনি ১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যের পোল্ডু থেকে নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেন্ট জনস পর্যন্ত 2000 মাইল দূরে তাঁর প্রথম ট্রান্সআটল্যান্টিক রেডিও যোগাযোগের জন্য রেডিও সংকেত পেতেীকটি রিসিভার উদ্ভাবন করেছিলেন। কিন্তু মার্কনি এই কৃতিত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী সম্মানিত হয়েছিলেন, কিন্তু যে রিসিভারটি যে বোস দ্বারা আবিষ্কার করেছিলেন তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছিলো শুধুমাত্র পেটেন্ট না নেওয়ার জন্যে, বঞ্চিত হয়েছিলেন নোবেল পুরষ্কার থেকেও।
পুরষ্কারের বঞ্চনা তার বিজ্ঞানচর্চায় কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। জৈব পদার্থবিজ্ঞান বা বায়োফিজিক্সের ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান অবদান ছিল উদ্ভিদের বিভিন্ন উদ্দীপনা সঞ্চালনের বৈদ্যুতিক প্রকৃতির প্রদর্শনী। তবে এই গবেষণাক্ষেত্রে,তার সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার হলো উদ্ভিদের বৃদ্ধি পরিমাপের জন্য "ক্রিসকোগ্রাফ" নামক যন্ত্রটির নির্মাণ।
জগদীশ চন্দ্র বসু একজন বিজ্ঞানী হিসাবে বিখ্যাত ছিলেন ঠিকই, তবে এটিই তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিলো না। তিনি জাতির জন্য অনুপ্রেরণার এক উৎসও ছিলেন। সুভাষ বোসের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধর্মঘট শুরু করলে তিনি তাদের সমর্থন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ বৈষম্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় লড়াইয়ের এক অন্যতম প্রতীক। ১৯১৭ সালে, তিনি ব্রিটিশ সরকার থেকে সম্মানসূচক "নাইট" উপাধিতে ভূষিত হন।
একজন মহান বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন চমৎকার লেখকও ছিলেন। জগদানন্দ রায়ের “শুক্র ভ্রমন” এর মতোই তাঁর কল্পবিজ্ঞান মূলক “নিরুদ্দেশের কাহিনী” এবং “পলাতক তুফান” বাংলা কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর সূচনা বলে বিবেচিত হতে পারে। ১৯২১ সালে, তিনি তার অন্যতম সেরা সাহিত্যকর্ম "অব্যক্ত" রচনা করেন।
অধ্যাপক হিসাবেও তিনি অসম্ভব খ্যাতিমান ছিলেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্র নাথ বোস, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিস, শিশির কুমার মিত্র, দেবেন্দ্র মোহন বোস তাঁর ছাত্র ছিলেন। তার অধ্যাপনার কৃতিত্বের জন্যই “আচার্য্য” নামে ভূষিত হন ও তার নামই হয়ে দাঁড়ায় আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস।
১৯০২ সালে তিনি ৮৩ সার্কুলার রোডে “আচার্য ভবন” নামে একটি বাড়ি নির্মান করেন। পরবর্তীতে সার্কুলার রোডের নাম হয় আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু রোড। তাঁর স্ত্রী আবালা বোস নারীশিক্ষায় তাঁর প্রচেষ্টার জন্য এবং বিধবাদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। জগদীশ গবেষণার পরিধি বাড়ানোর জন্য ১৯১৭ সালে এই বাড়িতেই "বোস ইনস্টিটিউট" প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে বোস ইনস্টিটিউট (বসু বিজ্ঞান মন্দির) ভারতের একটি শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ দ্বারা অনুমোদিত। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় কুড়িবছর ধরে তিনিই বসু বিজ্ঞান মন্দিরের পরিচালক ছিলেন।
 |
| আচার্য্য ভবন ও বসু বিজ্ঞান মন্দির |
৭৮ বছরের জীবদ্দশায় তিনি বিজ্ঞান, গবেষণা, সাহিত্য এমনকি শিক্ষায়ও তাঁর ছাপ রেখে গিয়েছেন। তাঁর অবদান এবং আগ্রহ অনেক ক্ষেত্রকেই সমৃদ্ধ করেছিল। তাঁর রচনা ও দেশপ্রেম ছিল উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর অব্যবস্থা, বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরূদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। এই দেশপ্রেমিক এবং তার সংগ্রাম সম্পর্কে কতজন "আজকের ভারতীয় দেশপ্রেমিক" জানেন তা সত্যি অজানা।
------------
আরও পড়ুন